লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে ভাড়া বাসায় মা ও তিন মেয়েকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যার ঘটনার তিন দিন পার হলেও হত্যার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। অভিযুক্ত হত্যাকারীর মাদকাসক্তি, তার সঙ্গে নিহত ব্যক্তিদের পূর্বপরিচয়, স্বর্ণালংকার লুট, অর্থ লেনদেন ও পূর্ববিরোধ-এখন পর্যন্ত সম্ভাব্য কারণ হিসেবে এগুলোই সামনে এসেছে। তবে কোনো একটি কারণের পক্ষে নিশ্চিত প্রমাণ পায়নি পুলিশ। ফলে এ নিয়ে নানান আলোচনা চলছে।
নিহতদের পরিচয় ও ঘটনার বিবরণ
নিহতরা হলেন-মা শাহিনুর বেগম (৩৮), বড় মেয়ে সায়মা আক্তার (২১), মেজ মেয়ে ইকরা আক্তার (১৭) ও ছোট মেয়ে শিফা আক্তার (৯)। সায়মা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ও ইকরা রায়পুর কাজী ফারুকী কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী। তাদের বাড়ি কুমিল্লার হোমনা উপজেলায়। দীর্ঘদিন ধরে পরিবারটি রায়পুরে ভাড়া বাসায় বসবাস করছিল। বাড়িতে না থাকায় শাহিনুরের একমাত্র ছেলে কলেজছাত্র জুনায়েদ ইসলাম শিফাত ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছে।
এদিকে এ ঘটনার পর পালানোর সময় অভিযুক্ত অন্তর মজুমদারকে স্থানীয় লোকজন আটক করে গণপিটুনি দেন। পরে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। অন্তরের বাড়ি নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলায়। তার বাবার নাম কার্তিক মজুমদার। এর আগে, বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকালে রায়পুর পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের গোডাউন রোডের ধানহাটা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
তদন্তের অগ্রগতি ও সম্ভাব্য কারণ
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ঘটনাটির পেছনের কারণ অনুসন্ধানে কয়েকটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা আলামত, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্বজনদের বক্তব্যসহ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করছে পুলিশ। স্থানীয়রা জানান, তদন্তে এখনো বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। হত্যার সময় বাসার ভেতরে ঠিক কী ঘটেছিল, অভিযুক্ত ব্যক্তির লক্ষ্য একজন ছিলেন নাকি পুরো পরিবার, হত্যার আগে কোনো বাগ্বিতণ্ডা হয়েছিল কি না কিংবা পূর্বপরিচয় থাকা সত্ত্বেও কেন এমন ভয়াবহ হামলা চালানো হলো-এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা।
নিহত শাহিনুর বেগমের ছোট ভাই ছানা উল্লাহ জানান, তার বোনের কাছে কিছু স্বর্ণালংকার ছিল। সেগুলো লুট করার উদ্দেশ্যেই হত্যাকাণ্ডটি ঘটতে পারে বলে তাদের সন্দেহ। তবে এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করে বের করার দাবি জানান তিনি।
সংসদ সদস্যের বক্তব্য ও দাফন
এদিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে লক্ষ্মীপুর-২ (রায়পুর) আসনের সংসদ সদস্য আবুল খায়ের ভূঁইয়া বলেন, ‘সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে যা হবে, আমরা তা মেনে নেব। এর সঙ্গে যদি অন্য কেউ জড়িত থাকে, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। এ ঘটনাকে পুঁজি করে কোনো ধরনের সম্প্রীতি নষ্ট করার চেষ্টা করা যাবে না।’
খুন হওয়া মা ও তিন মেয়ের মরদেহ কুমিল্লার হোমনা উপজেলার লটিয়া গ্রামের সামাজিক কবরস্থানে পাশাপাশি চারটি কবরে দাফন করা হয়েছে। গত শুক্রবার রাত ৯টা ৩১ মিনিটে লাশবাহী দুটি অ্যাম্বুলেন্সে করে মা ও তিন মেয়ের মরদেহ হোমনা উপজেলার লটিয়া গ্রামে পৌঁছায়। মা ও মেয়েদের মরদেহ একনজর দেখার জন্য লোকজন ভিড় করে। পরে লাশগুলো গ্রামের মেঘনা নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত সামাজিক কবরস্থানে নেওয়া হয়। সেখানে কবরস্থানের পাশের মাঠে মেঘনা নদীর তীরে রাত ১০টায় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে পাশাপাশি চারটি কবরে মা ও তিন মেয়ের মরদেহ দাফন করা হয়। রাত ১১টায় দাফনের কার্যক্রম শেষ হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা ও ময়নাতদন্ত
শহরের এনায়েতপুর এলাকার বাসিন্দা ও শিক্ষার্থী আবির হোসেন জানান, ঘটনার খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। ঘরের ভেতরে মা ও তিন মেয়ের রক্তাক্ত মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন। সেই দৃশ্য এখনো তার চোখে ভাসে। ঘটনার রাতে তিনি ঠিকমতো ঘুমাতে পারেননি।
মরদেহগুলোর ময়নাতদন্তের কাজে ছিলেন লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল কর্মকর্তা (আরএমও) অরূপ রায়। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। নিহত চারজনের শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ময়নাতদন্ত শেষে লাশগুলো পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
মামলা ও পুলিশের বক্তব্য
মা ও তিন মেয়েকে হত্যার ঘটনায় রায়পুর থানায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে। গত শুক্রবার নিহত শাহিনুর বেগমের ছেলে জুনায়েদ ইসলাম বাদী হয়ে মামলাটি করে। মামলায় অন্তর মজুমদার ছাড়াও অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। এ বিষয়ে রায়পুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শাহীন মিয়া বলেন, বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, স্বর্ণালংকার চুরি এবং আরও কয়েকটি বিষয় সামনে এসেছে। অভিযুক্ত ব্যক্তি মাদকাসক্ত ছিলেন বলেও কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে হত্যার কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত কিছু বলা সম্ভব নয়।



