ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১৩তম দিন মঙ্গলবার (২৩ জুন) সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রোকেয়া বেগম বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে জুলাই যোদ্ধাদের রাজনৈতিক সুরক্ষা দেওয়ার দাবি জানান। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।
জুলাই যোদ্ধাদের ওপর নির্যাতন ও স্মৃতিস্তম্ভ পোড়ানোর ঘটনা
রোকেয়া বেগম বলেন, জুলাইকে মুছে ফেলতে পলাতক ‘ফ্যাসিস্ট’ বাহিনী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিমাত্রায় তৎপর। বিভিন্ন স্থানে জুলাই যোদ্ধাদের ওপর নির্যাতন, হুমকি এবং স্মৃতিস্তম্ভ পোড়ানোর মতো নেক্কারজনক ঘটনা ঘটছে। জুলাই যোদ্ধাদের আইনি সুরক্ষা দেওয়া হলেও রাজনৈতিক সুরক্ষা দেওয়া হয়নি—এ বিষয়ে আইনমন্ত্রীর কাছে সুস্পষ্ট নির্দেশনা চান তিনি।
জুলাই স্মৃতিসৌধ ও জাদুঘর প্রতিষ্ঠার দাবি
তিনি আরও বলেন, জুলাইকে বাঁচাতে হলে জুলাই বিপ্লবের ইতিহাস, আহত যোদ্ধাদের কথা এবং শহীদের স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে জুলাই স্মৃতিসৌধ, জুলাই জাদুঘর, গবেষণা কেন্দ্র এবং ডিজিটাল আর্কাইভ প্রতিষ্ঠার জন্য বাজেটে বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন।
নিজ সন্তান শহীদ হওয়ার কথা উল্লেখ
২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বক্তব্যের শুরুতেই নিজের ছোট সন্তান শহীদ হওয়ার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ৫ আগস্ট তার ছোট ছেলে জাবির ইব্রাহিম গুলিবিদ্ধ হয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে শহীদ হন। তিনি বলেন, “আমার ছেলের মতো অসংখ্য শহীদের রক্ত ও অঙ্গহানির আর্তনাদে ভাসছে জাতীয় সংসদ।”
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছরের নানা জুলুম-নির্যাতনের পর এই রক্তস্নাত সংসদে বাজেট অধিবেশন চলছে। জুলাই আন্দোলন না থাকলে এটি সম্ভব হতো না।
বাজেটে জুলাই শহীদ ও আহতদের জন্য বরাদ্দের প্রশংসা
২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে জুলাই শহীদ পরিবারগুলোর জন্য মাসিক ভাতা, আহত যোদ্ধাদের জন্য শ্রেণিভিত্তিক ভাতা এবং আবাসন সহায়তার জন্য ৩০০ কোটি টাকার বরাদ্দ রাখার জন্য অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান তিনি।
হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি
রোকেয়া বেগম বলেন, একজন বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় চাওয়া সন্তানের হত্যার বিচার। দৃশ্যমান বিচার ছাড়া ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলুপ্তি সম্ভব নয়। তিনি প্রত্যেকটি হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেন।
আইনমন্ত্রীর বক্তব্য
তিনি সংসদকে জানান, ২০২৬ সালের ২১ জুনের প্রশ্নোত্তরে আইনমন্ত্রী বলেছেন, ২৪ জুলাই সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ৮০টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে সাতটির রায় ঘোষণা হয়েছে, ২২টি সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে এবং ৫১টি তদন্তাধীন।
তিনি আরও বলেন, এই মামলাগুলোর আসামি ৪৬৩ জন, এর মধ্যে ১৭৪ জন গ্রেফতার এবং ২৮৮ জন পলাতক। তিনি গ্রেফতার অগ্রগতি জানাতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
জুলাই যোদ্ধাদের তালিকাভুক্তিতে ঘাটতি
তিনি অভিযোগ করেন, জুলাই যোদ্ধাদের তালিকাভুক্তি ও গেজেটভুক্তিতে ঘাটতি রয়েছে। এখন পর্যন্ত ৮৩৪ জন শহীদের নাম তালিকাভুক্ত হলেও আরও অনেকের তালিকা প্রক্রিয়াধীন। অঙ্গহানি হওয়া জুলাই যোদ্ধাদের সঠিক ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত না করা এবং সেবা না পাওয়ার বিষয়েও তিনি অভিযোগ তোলেন।
আইনমন্ত্রীর জবাব
এদিকে, বক্তব্যের জবাবে আইনমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, যিনি শহীদ মাতা হিসেবে বক্তব্য দিয়েছেন, তার প্রতিটি আবেগ ও বক্তব্যকে তিনি শ্রদ্ধা জানান এবং সরকারের পক্ষ থেকে তা বিবেচনায় নেওয়া হয়।
তিনি বলেন, সরকার জুলাই যোদ্ধাদের আইনি সুরক্ষা দিয়েছে। রাজনৈতিক সুরক্ষা আলাদা করে নির্ধারণের বিষয় নয়; প্রতিটি আইনই একটি রাজনৈতিক দলিল এবং জননীতির অংশ। প্রয়োজন হলে আইনি কাঠামোর মধ্যেই অতিরিক্ত সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।



