আইএমএফের আগের ঋণ কর্মসূচি জনস্বার্থবিরোধী: অর্থমন্ত্রী
আইএমএফের আগের ঋণ কর্মসূচি জনস্বার্থবিরোধী: অর্থমন্ত্রী

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে আগের সরকারের নেওয়া ঋণ কর্মসূচিকে ‘সম্পূর্ণ জনস্বার্থবিরোধী’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, দেশের মানুষের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করেই আইএমএফের সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি করা হবে।

নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা

আজ রোববার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে এ কথাগুলো বলেন অর্থমন্ত্রী। এ সময় নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার অংশ হিসেবে আইএমএফের ১২ সদস্যের একটি মিশন অর্থ মন্ত্রণালয়ে বৈঠক করছিল। চলতি সপ্তাহজুড়ে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে বৈঠক করবে এ মিশন।

দিনভর আজ মিশনটির আটটি নির্ধারিত বৈঠক ছিল। এর মধ্যে বেলা ১টায় একটি ছিল অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে। তবে জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার ও সাবেক অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের জানাজায় অংশ নিতে যাওয়ায় ওই বৈঠক বাতিল করা হয় বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আইএমএফ মিশনের বৈঠক

আইএমএফের বাংলাদেশ মিশনপ্রধান ইভো ক্রজনারের নেতৃত্বে আজ দিনের প্রথম বৈঠকটি হয় অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারের সঙ্গে। এরপর অর্থ বিভাগের কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধিদের কাছে নিজেদের নীতি পরিকল্পনা উপস্থাপন করে আইএমএফ মিশন।

অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে বের হওয়ার সময় আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আরও বলেন, ‘আমাদের মূল চিন্তা টাকাপাওয়া নয়, দেশের স্বার্থ রক্ষা করা। দেশের মানুষের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে আইএমএফের সঙ্গে কোনো কর্মসূচিতে সরকার যাবে না।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আগের ঋণ কর্মসূচির সমালোচনা

আগের সরকারের নেওয়া আইএমএফের ঋণ কর্মসূচিকে ‘সম্পূর্ণ জনস্বার্থবিরোধী’ উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘একটি নির্বাচিত সরকার হিসেবে বাংলাদেশের মানুষের এবং দেশের অর্থনীতির স্বার্থ সুরক্ষিত রাখাই আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার। জনগণের অর্থনৈতিক স্বার্থ নিশ্চিত করে আইএমএফের সঙ্গে এমন একটি নতুন কর্মসূচিতে আমরা যাচ্ছি। যে কর্মসূচিতেই যা–ই না কেন, সেখানে বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ শতভাগ সংরক্ষিত থাকবে।’

নতুন ঋণের পরিমাণ ও ব্যবহার

নতুন কর্মসূচির আওতায় সরকার তিন বছর মেয়াদে ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ পাওয়ার আশাবাদী। অর্থ পাওয়া গেলে তা সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং বৈদেশিক অর্থায়নের চাপ মোকাবিলায় ব্যবহার করবে বাংলাদেশ। ঋণের জন্য গত ৯ জুন আইএমএফকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। এতে বলা হয়, আগের কর্মসূচি গ্রহণের সময়ের অর্থনৈতিক ও নীতিগত বাস্তবতা এখন আর নেই। দেশীয় রাজনৈতিক অর্থনীতি, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এবং নতুন চ্যালেঞ্জের কারণে কিছু সংস্কার বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়েছিল। তবে সরকার সংস্কার কর্মসূচি থেকে সরে আসতে চায় না, বরং দেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়ন করতে চায়।

পূর্বের ঋণ কর্মসূচির ইতিহাস

২০২৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকার আইএমএফের কাছ থেকে ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণের চুক্তি করেছিল। ২০২৫ সালের জুনে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সেই ঋণের আকার বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলার করা হয়। অনুমোদিত ওই ঋণ কর্মসূচির আওতায় পাঁচ কিস্তিতে বাংলাদেশ মোট ৩৬৪ কোটি ডলার পেয়েছে। তবে ষষ্ঠ কিস্তির অর্থছাড় নিয়ে প্রায় এক বছর ধরে আলোচনা চললেও শেষ পর্যন্ত তা পাওয়া যায়নি। এরই মধ্যে উভয় পক্ষ মিলে কর্মসূচিই বাতিল করে দিয়েছে।

নতুন ভিসা নীতি

আজ অর্থমন্ত্রী নতুন ভিসা নীতি নিয়েও কথা বলেন। তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে বিদ্যমান ভিসা নীতি আধুনিক করা হবে। এটি নিয়ে কাজ চলছে। এতে বিদেশি পর্যটক, বিনিয়োগকারী ও দক্ষ জনশক্তির বাংলাদেশে আসা সহজ হবে এবং বিদেশি বিনিয়োগও বাড়বে।

নতুন ভিসা নীতির ঘোষণা অবশ্য আসে ২ জুলাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠক থেকে। ওই বৈঠকে ২০০৬ সালের ভিসা নীতি সংশোধন করে নতুন নীতিমালার খসড়া উপস্থাপন করা হয়। বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি ওই দিন জানিয়েছিলেন, খসড়াটি পরিমার্জনের জন্য অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটিকে সাচিবিক সহায়তা দেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

নতুন ভিসা নীতির লক্ষ্য হচ্ছে বিদেশিদের বাংলাদেশে আগমন ও প্রস্থান সহজ করা, বিদেশি বিনিয়োগ ও ব্যবসা উৎসাহিত করা, পর্যটন খাতের বিকাশ, প্রযুক্তি ও জ্ঞান স্থানান্তর নিশ্চিত করা, জাতীয় নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা এবং আধুনিক ও সেবামুখী অভিবাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা।

আজকের বৈঠকের আলোচ্য বিষয়

আজকের বৈঠকগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সম্ভাব্য দ্বিতীয় সহনশীলতা ও টেকসই সুবিধা (আরএসএফ) কর্মসূচি। অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এ কর্মসূচির প্রস্তুতি, সম্ভাব্য কাঠামো ও শর্ত নিয়ে বেলা ২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি আগের সরকারের সময়ে নেওয়া প্রথম আরএসএফ কর্মসূচির আওতায় সংস্কার বাস্তবায়নের অগ্রগতিও পর্যালোচনা করা হয়েছে।

বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বৈঠকগুলোয় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ও মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য, রাজস্ব আহরণের পরিকল্পনা, ভর্তুকি ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি), বড় উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন পরিকল্পনা এবং অর্থায়নের উৎস নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

আইএমএফের সঙ্গে আলোচ্য অন্যান্য বিষয়

এ ছাড়া ২০২৬-২৭ অর্থবছর ও মধ্য মেয়াদে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কর্মসূচির ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলো একীভূত করার পরিকল্পনা, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, নতুন নিয়োগ, জনবলকাঠামো এবং বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির সূত্র হচ্ছে আইএমএফের সঙ্গে আলোচ্য বিষয়।