যুবলীগ নেতার ২ মাস কারাদণ্ড, চিফ প্রসিকিউটরের সাজা কমানোর অনুরোধে বিতর্ক
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নিয়ে ফেসবুকে অবমাননাকর পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে যুবলীগ নেতা এম এইচ পাটোয়ারী বাবুকে দুই মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রোববার বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই আদেশ দেন।
চিফ প্রসিকিউটরের অনুরোধ ও ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত
রায়ের আগে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হয়েও নজিরবিহীনভাবে আসামির পক্ষ নিয়ে বারবার ট্রাইব্যুনালকে সাজা কম দিতে অনুরোধ করেন। ট্রাইব্যুনাল প্রথমে বলে, "আসামির অপরাধ অত্যন্ত গুরুতর। এ ধরনের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সাজা না দিলে ভুল বার্তা যাবে। আমরা চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি যে, আমরা সম্পূর্ণ স্বচ্ছ আছি এবং আমাদের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে দেশি-বিদেশি কেউ প্রশ্ন তুলতে পারবেন না।"
ট্রাইব্যুনাল আরো উল্লেখ করে, "যেহেতু এই পোস্টটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, তাই তাকে ন্যূনতম সাজা হওয়া উচিত যাতে অন্যরা সতর্ক হয়। আমরা ১ বছর কারাদণ্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু আপাদের অনুরোধ ও পারিপাশ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে তিন মাসের কারাদণ্ড দিলাম।"
এরপর চিফ প্রসিকিউটর আবার সাজা কমানোর অনুরোধ করলে ট্রাইব্যুনাল পুনরায় ১ মাস কমিয়ে ২ মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়। চিফ প্রসিকিউটরের এভাবে আসামি পক্ষ নিয়ে বারবার সাজা কমানোর অনুরোধ উপস্থিত সবাইকে হতবাক করেছে। প্রশ্ন ওঠেছে রাষ্ট্রের নিযুক্ত আইনজীবী হয়ে তিনি এভাবে আসামির পক্ষ নিতে পারেন কিনা?
অভিযোগের বিবরণ ও তদন্ত প্রক্রিয়া
এম এইচ পাটোয়ারী বাবু নামের ফেসবুক আইডি থেকে দেওয়া একটি পোস্টে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার, সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল, সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম এবং সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনিরের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননাকর অভিযোগ তোলা হয়।
এই ফেসবুক পোস্টকে ‘বিভ্রান্তিকর’ ও ‘আদালত অবমাননাকর’ উল্লেখ করে প্রসিকিউশনের আবেদনের প্রেক্ষিতে গত ৮ এপ্রিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এম এইচ পাটোয়ারী বাবুর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আদেশ দেন। সেই সঙ্গে ওই ফেসবুক পোস্টে লাইক, শেয়ার ও অবমাননাকর মন্তব্যকারী ব্যক্তিদের গ্রেফতার ও তাদের ডিভাইস জব্দের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এদিন বিকাল সাড়ে ৩টার পর এ বিষয়ে শুনানি শুরু হয়। প্রথমেই বাবুর স্ত্রী ইসমাত আরার জবানবন্দি নেওয়া হয়। তিনি এ ঘটনার জন্য নিজেকে অপরাধী দাবি করে ট্রাইব্যুনালের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চান। পরে নেওয়া হয় আসামির জবানবন্দি।
তদন্তের বিস্তারিত তথ্য
আসামির জবানবন্দি শেষে এ মামলার বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা ও প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহার বক্তব্য শোনে ট্রাইব্যুনাল। তিনি জানান, আদালতের আদেশ অনুযায়ী গত ৭ এপ্রিল তারা মিরপুরের শেওড়াপাড়ায় (শেনপাড়া) বাবুর বাসায় অভিযান চালান। তবে, সেখানে তাকে না পেয়ে তার স্ত্রীর কাছ থেকে মোবাইল ফোনটি জব্দ করা হয়।
ডিবি ও মিরপুর মডেল থানা পুলিশের সহযোগিতায় পরিচালিত এই অভিযানের ধারাবাহিকতায় ৮ এপ্রিল বাবুর স্ত্রী ইসমাত জেরিনকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছিল। তখন তিনি চার দিনের মধ্যে তার স্বামীকে আদালতে উপস্থিত করার অঙ্গীকার করেছিলেন।
প্রসিকিউটর জোহা আরো জানান, জব্দ করা মোবাইল ফোনটি বর্তমানে ডিবি হেফাজতে রয়েছে, তবে তার ফেসবুক আইডিটি এখনও সক্রিয়। তিনি আরও উল্লেখ করেন, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা-কর্মীরা সাইবার স্কোয়াড নামে একটি গোপন গ্রুপ পরিচালনা করেন, যার অন্যতম সক্রিয় সদস্য ছিলেন দণ্ডিত বাবু।
এই গ্রুপের মূল কাজই হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যমূলক অপপ্রচার চালানো।
আসামির বক্তব্য ও ট্রাইব্যুনালের প্রতিক্রিয়া
শুনানিতে আসামিপক্ষের আইনজীবী ছিলেন নোমান হোসেন তালুকদার। প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। তার সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, ফারুক আহাম্মদ, আবদুস সাত্তার পালোয়ান ও মঈনুল করিমসহ অন্যরা।
এ সময় আসামি দাবি করেন, অন্য একটি আইডি থেকে লেখাটি কপি করে তিনি নিজের অ্যাকাউন্টে শেয়ার করেছিলেন। ভবিষ্যতে এ ধরনের উসকানিমূলক পোস্ট বা বক্তব্য দেবেন না বলে অঙ্গীকার করে তিনি ট্রাইব্যুনালের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
এসময় যাচাই করলে দেখা যায় তিনি কপি করে পোস্ট করেননি। নিজের আইডিতে ৪ এপ্রিল পোস্ট করেছেন। যেখান থেকে কপি করার কথা বলেছেন তা একদিন পরে ৫ এপ্রিল পোস্ট করা হয়। তখন ট্রাইব্যুনাল বলে, "আপনি এখনো মিথ্যা বলছেন।" এরপর রায় ঘোষণা করে ট্রাইব্যুনাল।
এই ঘটনায় আদালতের মর্যাদা রক্ষা ও সাইবার অপপ্রচারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত প্রশংসিত হলেও চিফ প্রসিকিউটরের ভূমিকা নিয়ে আইনি ও নৈতিক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর এমন আচরণ বিচার ব্যবস্থায় নতুন প্রসঙ্গ যোগ করেছে।



