আমির খান পর্দায় 'মিস্টার পারফেকশনিস্ট'। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে তাঁর গল্প কখনোই নিখুঁত ছিল না। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে ভালোবেসে বিয়ে, তারপর দীর্ঘ দাম্পত্যের অবসান, আবার নতুন সম্পর্কে জড়ানো, দ্বিতীয় সংসারও ভেঙে যাওয়া—সব মিলিয়ে আমিরের ব্যক্তিগত জীবন বরাবরই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেছে। এখন সেই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে তৃতীয় প্রেম। গৌরী স্প্র্যাটকে বিয়ে করতে যাচ্ছেন আমির। যদিও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো আসেনি, তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জুলাই মাসে ব্যক্তিগত পরিসরে তাঁদের বিয়ের পরিকল্পনার কথা বলা হচ্ছে। ৬০ পেরোনো বয়সে নতুন করে প্রেম খুঁজে পাওয়া, দুই সাবেক স্ত্রীর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং আবার বিয়ের সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়ে আমির খানের জীবন যেন এক সিনেমার চিত্রনাট্য।
প্রথম প্রেম, প্রথম বিদ্রোহ
আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে যখন আমির খানের অভিনয়জীবন মাত্র শুরু হচ্ছে, তখনই তাঁর জীবনে আসেন রীনা দত্ত। তাঁরা ছিলেন প্রতিবেশী। একে অপরকে দেখতেন, কথা বলতেন, ধীরে ধীরে প্রেমে পড়েন। কিন্তু সম্পর্কের পথে ছিল পারিবারিক বাধা। ভিন্ন ধর্ম ও পারিবারিক আপত্তির কারণে তাঁদের প্রেম সহজ ছিল না। কথিত আছে, রীনার মন জয় করতে আমির একবার নিজের রক্ত দিয়ে প্রেমপত্রও লিখেছিলেন। পরে অবশ্য তিনি নিজেই স্বীকার করেন, সেটি ছিল অপরিণত বয়সের আবেগী কাজ।
১৯৮৬ সালে পরিবারের অমতে গোপনে বিয়ে করেন আমির ও রীনা। তখন আমির তারকা নন, সংগ্রামী অভিনেতা। সংসারের শুরুটা ছিল স্বপ্ন আর অনিশ্চয়তায় ভরা। দুই বছর পর মুক্তি পায় 'কায়ামত সে কায়ামত তক'। রাতারাতি তারকা হয়ে ওঠেন আমির। আর সেই তারকাখ্যাতির উত্থানের সময় তাঁর সবচেয়ে বড় সমর্থক ছিলেন রীনা।
দাম্পত্য জীবনে তাঁদের ঘর আলো করে আসে দুই সন্তান—জুনাইদ খান ও ইরা খান। বাইরের দুনিয়ায় তাঁরা ছিলেন আদর্শ দম্পতি। কিন্তু বাস্তবতা ছিল আরও জটিল।
কেন ভাঙল ১৬ বছরের সংসার
২০০২ সালে হঠাৎ খবর আসে—বিচ্ছেদ হচ্ছে আমির ও রীনার। এই বিচ্ছেদ ছিল বলিউডের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি। কারণ, প্রায় ১৬ বছরের সংসার ভেঙে যাওয়ার পেছনে সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ কখনোই প্রকাশ্যে বলেননি দুজনের কেউ। আমির বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে ইঙ্গিত দিয়েছেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক বদলে গিয়েছিল। জীবনের চাহিদা, ব্যক্তিগত পরিবর্তন ও মানসিক দূরত্ব ধীরে ধীরে সম্পর্ককে ক্ষয় করেছে। বিচ্ছেদের পর রীনা সন্তানদের দায়িত্ব নেন। তবে আমির সন্তানদের জীবনে সক্রিয় ছিলেন এবং সময়ের সঙ্গে সাবেক স্ত্রীর সঙ্গেও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখেন। পরে আমির স্বীকার করেন, রীনার সঙ্গে বিচ্ছেদ তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর একটি ছিল।
কিরণ রাওয়ের আগমন
প্রথম সংসার ভাঙার পর আমিরের জীবনে আসেন কিরণ রাও। 'লগান' ছবির সময় সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করছিলেন কিরণ। তখন তাঁদের মধ্যে খুব বেশি ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়নি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে যোগাযোগ বাড়তে থাকে। আমির পরে একাধিকবার বলেছেন, জীবনের কঠিন সময় পার করতে কিরণ তাঁকে মানসিকভাবে অনেক সাহায্য করেছিলেন। ২০০৫ সালে বিয়ে করেন তাঁরা।
এই বিয়ে ছিল অনেকটাই ভিন্ন ধরনের। দুজনেই সৃজনশীল মানুষ। সিনেমা, সমাজ, রাজনীতি—নানা বিষয়ে তাঁদের আগ্রহ ছিল মিলিত। বিয়ের পর কিরণ শুধু স্ত্রী নন, আমিরের ঘনিষ্ঠ সহযোগীও হয়ে ওঠেন। অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে তাঁরা একসঙ্গে কাজ করেছেন। ২০১১ সালে সারোগেসির মাধ্যমে তাঁদের ছেলে আজাদ রাও খানের জন্ম হয়। দীর্ঘ সময় পর্যন্ত মনে হয়েছিল, এ সম্পর্কই হয়তো আমিরের জীবনের স্থায়ী ঠিকানা।
দ্বিতীয় বিচ্ছেদও কেন
২০২১ সালে যৌথ বিবৃতিতে বিচ্ছেদের ঘোষণা দেন আমির ও কিরণ। খবরটি অনেককে বিস্মিত করেছিল। কারণ, তাঁদের সম্পর্ককে বাইরে থেকে বেশ স্থিতিশীলই মনে হতো। বিবৃতিতে তাঁরা জানিয়েছিলেন, স্বামী-স্ত্রী হিসেবে আলাদা হলেও বন্ধু ও সহকর্মী হিসেবে একসঙ্গে থাকবেন। বিচ্ছেদের কারণ নিয়ে নানা জল্পনা থাকলেও দুজনের কেউই কখনো কাদা ছোড়াছুড়িতে জড়াননি। বরং বিচ্ছেদের পরও তাঁদের একসঙ্গে কাজ করতে দেখা গেছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, আমিরের কাজকেন্দ্রিক জীবন, ব্যক্তিগত পরিবর্তন এবং সময়ের সঙ্গে সম্পর্কের রূপান্তরই এই বিচ্ছেদের পেছনে ভূমিকা রেখেছিল। তবে প্রকৃত কারণ সম্পর্কে প্রকাশ্যে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি। বিচ্ছেদের পরও কিরণ ও আমিরের সম্পর্ক এতটাই স্বাভাবিক যে তাঁরা প্রায়ই পারিবারিক অনুষ্ঠানে একসঙ্গে দেখা দেন।
দুই সাবেক স্ত্রী, এক পরিবার
আমির খানকে নিয়ে সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়গুলোর একটি হলো তাঁর পারিবারিক সম্পর্কের ধরন। তিনি একাধিকবার বলেছেন, রীনা, কিরণ এবং তাঁর সন্তানরা মূলত একটি বড় পরিবারের মতোই আছেন। এমনকি নতুন সঙ্গী গৌরীকেও এই পারিবারিক পরিমণ্ডলে স্বাগত জানানো হয়েছে। বলিউডে যেখানে বিচ্ছেদের পর তিক্ততা প্রায় নিয়ম, সেখানে আমিরের এই সম্পর্ক বজায় রাখার সক্ষমতা অনেকের কাছেই ব্যতিক্রম।
আমির খানের জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, তিনি কখনোই সম্পর্ককে হালকাভাবে নেননি। দুবার বিয়ে করেছেন, দুবারই বিচ্ছেদ হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই সম্পর্ক শেষ হওয়ার পর সম্মান ও বন্ধুত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন। আজ যখন নতুন করে বিয়ের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, তখন প্রশ্ন উঠছে—তৃতীয়বার কি সত্যিই স্থায়ী ঠিকানা খুঁজে পেলেন বলিউডের 'মিস্টার পারফেকশনিস্ট'? এর উত্তর সময়ই দেবে।



