ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) অন্যতম জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজি কলকাতা নাইট রাইডার্সের (কেকেআর) সূচনা কিন্তু কোনো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বোর্ডরুমে বা কলকাতায় হয়নি। বরং এর বীজ রোপিত হয়েছিল জয়পুরের একটি ক্রিকেট স্টেডিয়ামে। সেদিন গ্যালারির হাজার হাজার দর্শককে উন্মাতাল হতে দেখেছিলেন আইপিএলের সাবেক চেয়ারম্যান ললিত মোদি, আর সেই উন্মাদনার কেন্দ্রে ছিলেন বলিউডের বাদশাহ শাহরুখ খান।
সম্প্রতি হিউম্যানস অব বোম্বেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ললিত মোদি কেকেআর-এর শুরুর গল্প শুনিয়েছেন। তিনি জানান, কীভাবে ক্রিকেট সম্পর্কে প্রায় অজ্ঞ এবং ফুটবলপ্রেমী এক বলিউড তারকাকে দল কিনতে রাজি করানো হয়েছিল, যার কাছে তখন পর্যাপ্ত অর্থও ছিল না।
জয়পুরের সেই ম্যাচ
ললিত মোদি বলেন, ‘আমি যখন বিসিসিআই-এর সহ-সভাপতি, তখন শাহরুখকে রাজস্থানের একটি ম্যাচ দেখতে নিয়ে যাই। জয়পুরের মাটিতে সেটিই ছিল প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ। আইপিএল শুরুর প্রায় এক বছর আগের ঘটনা। মাঠে শাহরুখ পা রাখামাত্র পুরো গ্যালারি ফেটে পড়ে। চোখের পলকে তিনি ম্যাচের মূল আকর্ষণে পরিণত হন।’
দর্শকদের এই অভাবনীয় উন্মাদনা ললিত মোদির ধারণাকে নিশ্চিত করে—ভারতে ক্রিকেট ও বলিউডকে এক সুতোয় গাঁথলে এমন একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ তৈরি সম্ভব, যা টেলিভিশনের প্রাইম-টাইম শাসন করবে।
প্রাইম-টাইম চ্যালেঞ্জ
বিসিসিআই-এর মাধ্যমে ললিত মোদি ইতিমধ্যেই ক্রিকেটের বিজ্ঞাপন বাজার নিজের নিয়ন্ত্রণে এনেছিলেন। কিন্তু আইপিএল-কে প্রতিযোগিতা করতে হতো ভারতীয় টেলিভিশনের জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটকের সঙ্গে, রাত ৮টার সবচেয়ে মূল্যবান স্লটে। মোদি বলেন, ‘ভারতে মূলত দুটি জিনিস সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়—ক্রিকেট এবং বলিউড। ক্রিকেটীয় বিজ্ঞাপনের টাকা আমি বিসিসিআই-এর জন্য নিশ্চিত করেছিলাম। বাকি বড় ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপনের বাজেট যেত বিনোদনে। আইপিএল-কে সফল করতে রাত ৮টার স্লটটি দরকার ছিল। ক্রিকেটকে আগে কখনো রাতের প্রাইম-টাইম প্রোডাক্ট হিসেবে ভাবা হয়নি। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপও দিনের আলোতেই হতো। রাতের বেলা মেগা ইভেন্ট নামানো বিশাল ঝুঁকি ছিল।’
ললিত মোদি হিসাব কষে দেখলেন, দলগুলোর মালিকানায় তারকা থাকলে ক্রিকেটপ্রেমী ও বিনোদন দুনিয়ার বিশাল দর্শক শ্রেণি খেলা দেখতে মাঠ ও টেলিভিশনে ভিড় জমাবে। তার প্রথম পছন্দ ছিলেন শাহরুখ খান।
ক্রিকেট না-বুঝা ফুটবলপ্রেমী
পরিকল্পনার মাঝে বড় বাধা ছিল—শাহরুখ ক্রিকেটের ভক্ত নন। ললিত মোদি হেসে বলেন, ‘দল মালিকানার জন্য শাহরুখের চেয়ে যোগ্য আর কে? কিন্তু মজার ব্যাপার, শাহরুখ ক্রিকেট পছন্দ করতেন না, বুঝতেনও না। তিনি ফুটবলের ভক্ত। দল কেনার প্রস্তাবে তিনি দ্বিধায় পড়ে যান এবং বলেন, “আমি তো ক্রিকেট বুঝি না।” আমি তাকে আশ্বস্ত করে বলি, ফুটবল নিয়েই থাকুন, ক্রিকেট ও দল গোছানোর দায়িত্ব আমার।’
এরপর বাধা ছিল আর্থিক। শাহরুখ জানতে চান, ‘দল পেলে কত দিতে হবে?’ মোদি জানান, প্রাথমিক ডাউন পেমেন্ট ২০ কোটি রুপি। শুনে শাহরুখের উত্তর, ‘কিন্তু এটা তো আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সঞ্চয়ের একটা বড় অংশ!’
নকিয়ার স্পনসরশিপে সমাধান
এই আর্থিক জটিলতার সমাধান বের করেন ললিত মোদি। সে সময় মোবাইল ব্র্যান্ড নকিয়া দীর্ঘদিন ধরে শাহরুখকে ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর করতে চাচ্ছিল, কিন্তু শাহরুখ আগ্রহী ছিলেন না। মোদি সুযোগটি কাজে লাগান। তিনি বলেন, ‘শাহরুখের ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপনে হস্তক্ষেপের সুযোগ আমার ছিল না। তাই সরাসরি নকিয়াকে প্রস্তাব দিই—শাহরুখ যদি দল কেনেন, তারা কি জার্সির প্রধান স্পনসর হবে? আমি গ্যারান্টি দিই যে শাহরুখ তাদের লোগো সম্বলিত জার্সি ও ক্যাপ পরবেন। বিনিময়ে ৫ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ২০ কোটি রুপি) অগ্রিম দাবি করি। তারা রাজি হয়ে যায়।’
এই দূরদর্শী চুক্তি সবার জন্যই লাভজনক ছিল। নকিয়ার জন্য শাহরুখের দলের স্পনসর হওয়া বিশাল ব্র্যান্ডিং, আর নকিয়ার অগ্রিম টাকায় শাহরুখের পকেট থেকে কোনো টাকা খরচ হয়নি। ললিত মোদির ভাষায়, ‘সে মূলত বিনামূল্যে দলটি পেয়ে গিয়েছিল।’
পুরো অর্থায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় মাত্র এক দিনে। দুপুর ১২টায় শাহরুখ দল কেনার চেকে সই করেন, বিকেলের মধ্যেই নকিয়া কেকেআর কনসোর্টিয়ামের স্পনসরশিপের অগ্রিম চেক বুঝিয়ে দেয়।
পরবর্তীতে জুহি চাওলা ও ব্যবসায়ী জয় মেহতার যৌথ মালিকানায় কলকাতা নাইট রাইডার্স বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম জনপ্রিয়, বাণিজ্যিকভাবে সফল এবং একাধিক শিরোপাজয়ী ফ্র্যাঞ্চাইজি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। আর এভাবেই ক্রিকেট না-বোঝা এক ফুটবলপ্রেমী মালিকের হাত ধরে যাত্রা শুরু হয় কেকেআরের।



