সরকারি চাকরিতে কঠোর বিধি: আন্দোলন ও অনুপস্থিতিতে চাকরি হারানোর শাস্তি
অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক জারিকৃত মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি হুবহু বিল আকারে সংসদে পাশের জন্য বিশেষ কমিটি সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ‘সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী ১০ এপ্রিলের মধ্যেই এই বিলটি সংসদে পাশ হওয়ার কথা রয়েছে।
চাকরিজীবীদের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান
বিলটি আইনে পরিণত হলে সরকারি চাকরিজীবীরা ছুটি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলে এবং কোনো ধরনের আন্দোলনে উসকানি দিলে চাকরি হারাতে পারেন। অধ্যাদেশে সরাসরি ‘সভা-সমাবেশ’ বা ‘আন্দোলন’ শব্দটি না থাকলেও সেটি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
নতুন বিধান অনুযায়ী, নিম্নলিখিত কাজে জড়িত হলে সরকারি কর্মচারীদের শাস্তি দেওয়া যাবে:
- অনানুগত্যের শামিল কোনো কাজে লিপ্ত হওয়া
- ছুটি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা
- অন্য কর্মচারীদের কাজে বাধা দেওয়া বা অনুপস্থিত থাকতে প্ররোচিত করা
এ ধরনের কাজের জন্য সরকার তিন ধরনের শাস্তি দিতে পারবে:
- নিম্নপদ বা নিম্নবেতন গ্রেডে অবনমিতকরণ
- চাকরি থেকে অপসারণ
- চাকরি থেকে বরখাস্ত
অধ্যাদেশের পটভূমি ও সংশোধন
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে সহজেই শাস্তি দেওয়ার সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে এই অধ্যাদেশের খসড়া প্রথম অনুমোদন পায় গত বছরের ২২ মে। তবে এ নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দেয় এবং তারা আন্দোলনে নামেন।
কর্মচারীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকার গত ৩ জুলাই অধ্যাদেশটিতে সংশোধনী আনে। প্রথম সংশোধনীতে কারণ দর্শাও নোটিশ ছাড়াই শাস্তির বিধান ছিল, যা পরে পরিবর্তন করে কারণ দর্শাও নোটিশ ও আপিলের সুযোগ রাখা হয়।
সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশেও পরিবর্তন
বিশেষ কমিটি ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫’ও হুবহু বিল আকারে সংসদে পাশের সুপারিশ করেছে। এই অধ্যাদেশে সাইবার নিরাপত্তা আইনের বিতর্কিত ৯টি ধারা বাদ দেওয়া হয়েছে এবং আগের আইনে হওয়া সকল মামলা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
নতুন অধ্যাদেশের উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো:
- প্রথমবারের মতো ইন্টারনেটকে নাগরিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি
- অনলাইন জুয়া নিষিদ্ধের প্রস্তাব
- ধর্মীয় উসকানিমূলক বক্তব্যকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ
- সাইবার জগতে নারী ও শিশু নির্যাতন ও যৌন হয়রানিকে অপরাধ হিসেবে গণ্য
সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশে সংশোধন
বিশেষ কমিটি ‘সন্ত্রাস বিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এ সংশোধনী এনে বিল আকারে পাশের সুপারিশ করেছে। গত বছরের ১১ মে এই অধ্যাদেশ জারি করা হয়, যাতে ২০০৯ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ২০ নম্বর ধারায় সংশোধনী আনা হয়।
এই অধ্যাদেশের মাধ্যমেই গত বছর আওয়ামী লীগ ও এর সব সহযোগী-অঙ্গসংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে অন্তর্বর্তী সরকার। তবে এতদিন নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার শাস্তির সুনির্দিষ্ট বিধান ছিল না। বিশেষ কমিটি এখন অধ্যাদেশটিতে শাস্তির বিধান যুক্ত করার সুপারিশ করেছে।
এই তিনটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে সরকারি চাকরির শৃঙ্খলা, সাইবার নিরাপত্তা এবং সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে, যা দেশের আইনি কাঠামোতে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।



