১৮ বছর বয়সী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী হেনরি নোভাক হত্যাকাণ্ড ঘিরে বর্তমানে উত্তাল যুক্তরাজ্য। হত্যাকারীর বিরুদ্ধে আদালতের রায় ঘোষণার পর শুধু দক্ষিণ ইংল্যান্ডের সাউদাম্পটন নয়, জাতীয় পর্যায়েও পুলিশি আচরণ, বর্ণবাদ, আইন প্রয়োগ এবং তথাকথিত দ্বৈত পুলিশিং নীতি নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। ডানপন্থী কর্মীদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।
ঘটনার সূত্রপাত
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৫ সালের ৩ ডিসেম্বর রাতে ইংল্যান্ডের সাউদাম্পটনের বেলমন্ট রোডের পোর্টসউড এলাকায়। ইউনিভার্সিটি অব সাউদাম্পটনের ফাইন্যান্স বিভাগের শিক্ষার্থী হেনরি নোভাক বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। এ সময় তাঁর মুখোমুখি হন ২৩ বছর বয়সী ভিকরাম ডিগওয়া। পরে ডিগওয়া একটি বড় ছুরি দিয়ে হেনরিকে পাঁচবার আঘাত করেন। আঘাতের একটি তাঁর বুক ভেদ করে ফুসফুস ও প্রধান রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত করে, যা শেষ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যুর কারণ হয়।
আদালতে বক্তব্য ও রায়
আদালতে ডিগওয়া দাবি করেন, হেনরি তাঁকে বর্ণবাদী গালি দিয়েছিলেন, আক্রমণ করেছিলেন এবং তাঁর পাগড়ি খুলে ফেলেছিলেন। তিনি আত্মরক্ষার্থে ছুরি ব্যবহার করেছেন বলে দাবি করেন। তবে বিচার চলাকালে প্রসিকিউশন এই বক্তব্যকে সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণ করে। আদালত রায় দেন যে এটি আত্মরক্ষার ঘটনা নয়, বরং একটি হত্যাকাণ্ড।
পুলিশের ভূমিকা বিতর্কিত
এই মামলার সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ হলো পুলিশের প্রাথমিক ভূমিকা। ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর ডিগওয়া পুলিশকে জানান যে তিনিই বর্ণবাদী হামলার শিকার। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ গুরুতর আহত হেনরি নোভাককেই সন্দেহভাজন হিসেবে বিবেচনা করে। পরে প্রকাশিত পুলিশের বডিক্যাম ভিডিওতে দেখা যায়, রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে পড়ে থাকা হেনরি বারবার বলছেন, ‘আমি ছুরিকাহত হয়েছি’ এবং ‘আমি শ্বাস নিতে পারছি না’। কিন্তু একজন পুলিশ কর্মকর্তা তাকে বলেন, ‘আমি মনে করি না তুমি ছুরিকাহত হয়েছ।’ এরপর মৃত্যুপথযাত্রী হেনরিকে হাতকড়া পরানো হয়। কিছুক্ষণ পর তিনি অচেতন হয়ে পড়েন।
ভিডিওটি প্রকাশের পর দেশজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, যদি ডিগওয়া বর্ণবাদী হামলার অভিযোগ না করতেন, তাহলে পুলিশ কি একইভাবে আচরণ করত? ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ভিডিওটি দেখে বলেছেন, তিনি ‘অসুস্থ বোধ করেছেন’ এবং পুলিশের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে ‘গুরুতর প্রশ্ন’ রয়েছে। ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট এক পুলিশ কর্মকর্তা পদত্যাগ করেছেন এবং স্বাধীন তদন্ত শুরু হয়েছে।
আদালতের রায় ও সাজা
২৮ মে সাউদাম্পটন ক্রাউন কোর্ট ডিগওয়াকে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে। ১ জুন তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। আদালত নির্দেশ দেন, তাঁকে কমপক্ষে ২১ বছর কারাগারে থাকতে হবে।
বিক্ষোভ ও সংঘর্ষ
রায় ঘোষণার পর ২ জুন সাউদাম্পটনে প্রায় এক হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। প্রথমে বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকলেও পরে তা সহিংস রূপ নেয়। বিক্ষোভকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট, বোতল, চেয়ার ও ফ্লেয়ার নিক্ষেপ করেন। এতে ১১ জন পুলিশ কর্মকর্তা এবং একটি পুলিশ কুকুর আহত হয়। বিক্ষোভ থেকে অন্তত দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
বিক্ষোভে ডানপন্থী কর্মী টমি রবিনসন, ইউকিপ নেতা নিক টেনকোনিসহ বিভিন্ন অভিবাসনবিরোধী ও জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীর সদস্যদের উপস্থিতি দেখা যায়। রিফর্ম ইউকের নেতা নাইজেল ফারাজও ঘটনাটিকে ‘দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁরা দাবি করছেন, পুলিশ বর্ণবাদী বলে অভিযুক্ত হওয়ার ভয়ে প্রকৃত ভুক্তভোগীর পরিবর্তে হেনরিকেই সন্দেহভাজন হিসেবে বিবেচনা করেছিল।
ধর্মীয় ছুরির ব্যবহার
আদালতে বলা হয়, ভিকরাম ডিগওয়া হত্যাকাণ্ডে একটি শিখ ধর্মীয় ছুরি (কিরপান) ব্যবহার করেছিলেন। বিচারক মন্তব্য করেন, তিনি ধর্মীয় অধিকারের অপব্যবহার করেছেন এবং তাঁর কর্মকাণ্ড শিখ সম্প্রদায়ের সুনাম ক্ষুণ্ন করেছে। এদিকে হত্যাকাণ্ডের পর ডিগওয়ার পরিবারের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে পুলিশ তলোয়ার, ছুরি ও অন্যান্য অস্ত্র উদ্ধার করে। পরে অস্ত্র আইনে তাঁর বাবা ও ভাইয়ের বিরুদ্ধে পৃথক অভিযোগ আনা হয়। এ ছাড়া হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র গোপন করার অভিযোগে তাঁর মায়ের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
পরিবারের আহ্বান
এদিকে হেনরি নোভাকের পরিবার বারবার শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, হেনরির মৃত্যু যেন ঘৃণা, বিভাজন বা সহিংসতা ছড়ানোর হাতিয়ার না হয়। তবে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ জবাবদিহি ও সত্য উদ্ঘাটনের দাবি তারা অব্যাহত রেখেছে।



