কিশোর অপরাধের ভয়াবহ চিত্র: আইনি ফাঁকফোকরে বাড়ছে অপরাধপ্রবণতা
কিশোর অপরাধ: আইনি ফাঁকফোকরে বাড়ছে অপরাধপ্রবণতা

কিশোর অপরাধের ভয়াবহ চিত্র: আইনি ফাঁকফোকরে বাড়ছে অপরাধপ্রবণতা

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পেছনে উঠতি বয়সি কিশোরদের অপরাধপ্রবণতা একটি বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বিষয়টি এখন আর কেবল পারিবারিক দুশ্চিন্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং জাতীয় উদ্বেগের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। আইন কমিশনের সাম্প্রতিক গবেষণা প্রতিবেদন থেকে যে ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে, তাতে দেখা যায় অপরাধে লিপ্ত শিশুদের একটি বিশাল অংশ—প্রায় ৪৬ শতাংশই ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সি।

আইনের দ্বিমুখী অবস্থান ও বিভ্রান্তি

বাংলাদেশে প্রচলিত বিভিন্ন আইনে শিশুর সংজ্ঞার মধ্যে যে বৈপরীত্য রয়েছে, তা অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর। 'শিশু আইন, ২০১৩' অনুযায়ী অনূর্ধ্ব ১৮ বছর বয়সি সকল ব্যক্তিই শিশু। অথচ 'নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০'-এ ১৬ বছর পর্যন্ত ব্যক্তিকে শিশু এবং তৎপরবর্তী বয়সিদের কিশোর হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। আবার 'দ্য মেজরিটি অ্যাক্ট, ১৮৭৫' অনুযায়ী ১৮ বছর হলেই একজন ব্যক্তি প্রাপ্তবয়স্ক বলে বিবেচিত হন।

আইনের এই দ্বিমুখী অবস্থানের সুযোগ নিচ্ছে ধূর্ত অপরাধী ও দাগী সন্ত্রাসীরা। তারা জেনে গেছে যে, ১৮ বছর বয়স পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত গুরুতর অপরাধ করলেও শিশু আইনের দোহাই দিয়ে কঠোর শাস্তি থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। এই আইনি সীমাবদ্ধতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে 'কিশোর গ্যাং'-এর পৃষ্ঠপোষকরা কোমলমতি কিশোরদের দিয়ে ঘাতক বাহিনীর মতো দুষ্কর্ম করিয়ে নিচ্ছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গুরুতর অপরাধে কিশোরদের সম্পৃক্ততা

হত্যা, ধর্ষণ, মাদক ও ডাকাতির মতো গুরুতর অপরাধে এই বয়ঃসন্ধিকালের কিশোরদের সম্পৃক্ততা সমাজব্যবস্থাকে এক চরম অস্থিরতার মুখে ঠেলে দিয়েছে। তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গাজীপুর ও যশোরের শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রগুলোতে অবস্থানরত শিশুদের সিংহভাগই ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সি এবং তাদের বিরুদ্ধেই হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের অভিযোগ বেশি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এই বয়সের কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক গঠন অনেক ক্ষেত্রেই প্রাপ্তবয়স্কদের মতো বিকশিত হয়। তারা অপরাধের গুরুত্ব ও ফলাফল অনুধাবন করার সক্ষমতা রাখে। অথচ আইনের রক্ষাকবচ তাদের বেপরোয়া করে তুলছে। আইন কমিশনের সেমিনারে অংশ নেওয়া ৯৪ ভাগ অংশীজন এই বয়সসীমা পরিবর্তনের পক্ষে মত দিয়েছেন।

আইন সংশোধনের জরুরি দাবি

এমতাবস্থায়, প্রচলিত শিশু আইনের সংশোধন ও অপরাধের প্রকৃতি অনুযায়ী শিশুদের বয়সসীমা পুনর্নির্ধারণ করার বিষয়টি আজ সময়ের অনিবার্য দাবিতে পরিণত হয়েছে। অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করে এবং পারিপার্শ্বিক বাস্তবতা বিচার করে গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে শিশুদের বয়সসীমা ১৮ থেকে ১৬ বছরে নামিয়ে আনার বিষয়টি সরকারের গভীরভাবে ভেবে দেখা উচিত।

কেবল আইন কঠোর করলেই এই সমস্যার সমাধান হবে না। শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রগুলোর শোচনীয় অবস্থাও অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত শিশু রাখার ফলে, সেখানে প্রকৃত সংশোধনের চেয়ে অপরাধের দীক্ষা গ্রহণই বেশি হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

সম্মিলিত উদ্যোগের আহ্বান

সমাজ ও রাষ্ট্রকে এই ব্যাধি থেকে মুক্ত করতে হলে কিশোর গ্যাং কালচারের মূল উৎপাটন করতে হবে। যারা আড়াল থেকে এই শিশুদের বিপথে চালিত করছে, তাদের আইনের আওতায় আনা সর্বাগ্রে প্রয়োজন। আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এবং দেশের নিজস্ব আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে শিশু আইন সংশোধন করা হোক।

শিশুদের সুরক্ষার নামে অপরাধীদের আশকারা দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। কিশোর অপরাধ দমনে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সম্মিলিতভাবে জাগ্রত হতে হবে। আইনের ফাঁকফোকর বন্ধ করে কিশোর অপরাধীদের যথাযথ বিচার নিশ্চিত করা এবং প্রকৃত সংশোধনাগার গড়ে তোলাই হবে এই মুহূর্তের প্রধান কর্তব্য। নতুবা আগামীর ভবিষ্যৎ এক অন্ধকার গহ্বরে তলিয়ে যাবে, যার দায়ভার এই জাতিকেই বহন করতে হবে।