তদন্তাধীন ২৫ কারা কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পুনর্বহাল: বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
নানা অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া ২৫ জন কারা কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে লোকবল সংকটের অজুহাতে কাজে ফিরিয়েছে কারা অধিদপ্তর। গত ৯ মার্চ কারা মহাপরিদর্শকের কার্যালয় থেকে সব জেল সুপারকে চিঠি পাঠিয়ে এই ২৫ জনকে দায়িত্বে পুনর্বহালের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের পুনর্বহাল করা ভুল বার্তা দিচ্ছে এবং নিয়মের পরিকাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
কে কারা এই পুনর্বহালকৃত কর্মকর্তা-কর্মচারী?
এই ২৫ জনের মধ্যে দুজন ডেপুটি জেলার, ২২ জন কারারক্ষী এবং একজন গাড়িচালক রয়েছেন। ডেপুটি জেলার দুজন হলেন সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের সাবেক ডেপুটি জেলার মো. মনিরুল হাসান এবং ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারের সাবেক ডেপুটি জেলার মো. ইমতিয়াজ জাকারিয়া। রাঙামাটি জেলা কারাগারের গাড়িচালক মো. বনি ইসরাইলও এই তালিকায় আছেন।
মনিরুল হাসানকে গত বছরের ৭ ডিসেম্বর বিনা অনুমতিতে কর্মস্থল ত্যাগ করে একটি হোটেলে এক নারীকে নিয়ে থাকার অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। ইমতিয়াজ জাকারিয়াকে গত ২৯ জানুয়ারি ময়মনসিংহ কারাগার থেকে জামিনের আদেশ ছাড়াই তিন বন্দীকে মুক্তি দেওয়ার ঘটনায় দায়িত্ব-কর্তব্যে অবহেলা ও অসদাচরণের অভিযোগে বরখাস্ত করা হয়। বনি ইসরাইলসহ বাকি ২২ জন কারারক্ষীও নানা অপরাধে সাময়িক বরখাস্ত হয়েছিলেন।
পুনর্বহালের যুক্তি কী?
কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেনের স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, কারাগারগুলোতে বিভিন্ন অপরাধে কারা কর্মচারীরা সাময়িক বরখাস্ত অবস্থায় রয়েছেন। তাঁরা কর্মে না থাকায় দপ্তর ও কারাগারসমূহে ডিউটি-সংকট সৃষ্টি হয়েছে, ফলে কারাগারে স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
এছাড়া চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সাময়িক বরখাস্ত থাকাকালীন তাঁদের খোরাকি ভাতা বাবদ সরকারের বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে, অথচ তাঁদের কর্মদক্ষতা থেকে সরকার বঞ্চিত হচ্ছে, যা সরকারের আর্থিক ক্ষতি। কারা মহাপরিদর্শক প্রথম আলোকে বলেন, "তারা বসে বসে সরকারের বেতন নিচ্ছে। তাই লোকবল-সংকট বিবেচনায় তাঁদের কাজে লাগানো হয়েছে।"
বিশেষজ্ঞদের মত: ভুল বার্তা যাচ্ছে
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিয়া বলেন, সাময়িক বরখাস্ত করা মানে হলো একটি সংস্থায় তদন্ত চলাকালীন ওই কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখা, যাতে তদন্তে কোনো প্রভাব না পড়ে। কিন্তু তদন্ত চলাকালীন তাঁদের পুনর্বহাল করায় বরখাস্তের আদেশের প্রধান উদ্দেশ্যটাই ব্যাহত হয়।
ফিরোজ মিয়া আরও বলেন, "বিদ্যমান আইনের দুর্বলতা ও ফাঁকের সুযোগ নিয়ে এমনটি করা হয়। কিন্তু অনৈতিক ও দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কাজে পুনর্বহাল করা উচিত না, যত জনবল সংকট থাকুক। তাহলে এই সুযোগ নিয়ে আরও অপকর্ম করবে। এতে জনমনেও ভুল বার্তা যাবে।"
তিনি উল্লেখ করেন, তদন্ত শেষে নির্দোষ প্রমাণিত হলে পুনর্বহাল হওয়া স্বাভাবিক। তবে তদন্ত শেষ না হলে বা শাস্তি কার্যকর না হলে পুনর্বহাল হওয়া নিয়মের পরিকাঠামোকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
তদন্ত কী অবস্থায়?
কারা মহাপরিদর্শক জানান, এই ২৫ জন ছাড়াও ৩০ থেকে ৩৫ জন সাময়িক বরখাস্ত হয়ে আছে। পুনর্বহালকৃতদের প্রাথমিক তদন্ত ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে, তবে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ করতে সময় লাগবে। তিনি বলেন, "এর মানে এই নয় যে তাদের চাকরি যাবে না বা বিষয়টি শেষ হয়ে গেছে। তদন্ত শেষে তারা বিভাগীয় শাস্তি পেতে পারে।"
ইমতিয়াজ জাকারিয়াকে সিলেটে বদলি করা হয়েছে, এবং মনিরুল হাসানসহ অন্যান্যরা তাদের পূর্বের বা নতুন দায়িত্বে যোগ দিয়েছেন। এই ঘটনা কারা প্রশাসনে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতার প্রশ্ন তুলে ধরছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।



