চট্টগ্রাম আদালতে ইউপি নির্বাচন হামলা মামলা: প্রত্যাহারের সুপারিশ ও বাদীর তীব্র আপত্তি
চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে হামলার এক মামলা রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে। তবে বাদীপক্ষ দাবি করছেন, এটি কোনো রাজনৈতিক মামলা নয় এবং প্রত্যাহার হলে ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত হবে। মামলাটির শুনানি ৫ এপ্রিল নির্ধারিত রয়েছে।
ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ ও মামলার পটভূমি
২০২১ সালের ২৬ ডিসেম্বর, চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের পানত্রিশা এলাকায় এক সহিংস ঘটনা ঘটে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সদস্যপদের প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমের সমর্থকদের ওপর প্রতিপক্ষ জানে আলমের লোকজন দা, কিরিচ ও লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালায়। এতে নুর আহাম্মদ, বশির আহম্মদ ও নুরুন্নাহারসহ মোট ১৩ জন গুরুতর আহত হন।
ঘটনায় প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী তানজিলা সুলতানা বাদী হয়ে লোহাগাড়া থানায় মামলা দায়ের করেন। তদন্ত শেষে চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা পুলিশ ২০২৩ সালের ১৬ এপ্রিল আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়। অভিযোগপত্রে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, রেজাউল বাহার, জানে আলম, ইরফানুল হক চৌধুরী, মাহাবুবুর রহমানসহ ৩০ জনকে আসামি করা হয়।
আদালতের কার্যক্রম ও প্রত্যাহারের সুপারিশ
চট্টগ্রামের অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ৩০ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন। বর্তমানে মামলাটি সাক্ষ্য শুরুর জন্য অপেক্ষমান।
এদিকে, সরকার ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়ের মধ্যে রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়। এই নীতির আওতায় লোহাগাড়া থানার মামলাটিও প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে। আসামিরা আবেদন করায় এই সুপারিশ গৃহীত হয়।
বাদীর প্রতিক্রিয়া ও আইনি লড়াই
বাদী তানজিলা সুলতানা প্রত্যাহারের সুপারিশের বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন। তিনি আদালতে আবেদন করে দাবি করেন, আসামিরা বাদীর পরিবারের সদস্যদের ধারালো অস্ত্র দিয়ে মারাত্মকভাবে জখম করেছেন। এটি একটি সহিংস অপরাধ, রাজনৈতিক মামলা নয়।
তিনি প্রথম আলোকে বলেন, "আসামিরা তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ইউপি নির্বাচনে আমাদের পক্ষে কাজ না করায় এই হামলা চালায়। তাদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হামলার মামলাও রয়েছে। এটি রাজনৈতিক কোনো হামলা নয়, প্রত্যাহার হলে আমরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হব।"
বাদী ইতিমধ্যে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদন করেছেন, যাতে মামলাটি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নাকচ করা হয়।
আসামির বক্তব্য ও আইনজীবীর মতামত
আসামি সিরাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে দাবি করেন, রাজনৈতিকভাবে হয়রানি করতে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলাটি করা হয়েছে। তিনি নিজেকে একসময়ের বিএনপির কর্মী দাবি করে বলেন, "আওয়ামী লীগের কারও সঙ্গে আমার সখ্য নেই। স্কুলে তৎকালীন আওয়ামী লীগের লোকজন এসেছিল, তাদের সঙ্গে হয়তো ছবি থাকতে পারে।"
চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি আশফাক হোসেন চৌধুরী বিষয়টি সম্পর্কে মন্তব্য করেন, "রাজনৈতিক হয়রানিমূলক বেশির ভাগ মামলা পুলিশ কিংবা বিগত আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের করা। লোহাগাড়ার মামলাটি ইউপি নির্বাচনে এক প্রার্থীর পক্ষে কাজ না করায় ক্ষুব্ধ হয়ে মারধরের। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে।"
মামলাটির ভবিষ্যৎ এখন আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে, যেখানে বাদীর আপত্তি এবং সরকারের প্রত্যাহার নীতির মধ্যে একটি জটিল আইনি দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে।



