বাংলাদেশের নদী: মাতৃস্নেহ থেকে বিষাক্ত ধারায়, দূষণে বিপন্ন প্রাণপ্রবাহ
বাংলাদেশের নদী দূষণ: মাতৃস্নেহ থেকে বিষাক্ত ধারায়

বাংলাদেশের নদী: মাতৃস্নেহ থেকে বিষাক্ত ধারায়, দূষণে বিপন্ন প্রাণপ্রবাহ

বাংলাদেশের নদীগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই ভূখণ্ডের জীবন, ইতিহাস ও সভ্যতার নীরব সাক্ষী। কবিদের কলমে নদী তুলনা হয়েছে মাতৃস্নেহের মতো, আর তাই এই দেশকে বলা হয় নদীমাতৃক। কিন্তু আজ সেই নদীগুলো ধীরে ধীরে দূষণের অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে, যেখানে স্বচ্ছ প্রবাহের বদলে দেখা মিলছে কালো, দূষিত পানি ও মৃত জলজ প্রাণী।

বিশ্বব্যাপী নদী দূষণের ভয়াবহতা

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট বর্জ্য পানির প্রায় ৮০ শতাংশই কোনো ধরনের শোধন ছাড়াই নদী ও জলাশয়ে ফেলা হয়, যা নদী দূষণের প্রধান কারণ। এর ফলে বিশ্বের প্রায় ২২০ কোটি মানুষ নিরাপদ পানির সুবিধা থেকে বঞ্চিত এবং দূষিত পানি ব্যবহারের কারণে প্রতিবছর প্রায় আট লক্ষ মানুষ মারা যান। ‘স্টেট অব রিভার্স অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড’ নামক একটি আন্তর্জাতিক জরিপে দেখা গেছে, বিশ্বের ৮৬ শতাংশ মানুষ মনে করেন নদী দূষণ সরাসরি মানবস্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে। দূষিত নদীর পানি ব্যবহার ডায়রিয়া, কলেরা, চর্মরোগ ও শ্বাসকষ্টের মতো জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বাংলাদেশের নদীগুলোর করুণ দশা

শিল্পায়ন, দ্রুত নগরায়ন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশেও নদী দূষণের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে। দেশের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কারখানা নদীর তীরে গড়ে উঠেছে, বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামের কাছে অবস্থিত কর্ণফুলী, বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা ও তুরাগ নদীর আশেপাশে বিপুল সংখ্যক শিল্পকারখানা নির্মিত হয়েছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) এক জরিপ অনুসারে, শিল্পকারখানার ৬০ শতাংশ বর্জ্য এবং ঢাকা ওয়াসা ও সিটি কর্পোরেশনের ৩০ শতাংশ বর্জ্য সরাসরি নদীতে পড়ছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, রাজধানীর আশেপাশের নদীগুলো প্রতিদিন হাজার হাজার ঘনমিটার অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য ও নগরবর্জ্য বহন করছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দূষণের মূল কারণ ও প্রভাব

পর্যাপ্ত বর্জ্য শোধনাগারের অভাব নদী দূষণের একটি প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। টেক্সটাইল, ট্যানারি, রাসায়নিক ও ওষুধ শিল্প থেকে নির্গত ভারী ধাতু ও ক্ষতিকর রাসায়নিক নদীর পানির গুণাগুণ নষ্ট করছে এবং মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর জন্য মারাত্মক ক্ষতি করছে। একসময় দেশের নদীতে শত শত প্রজাতির মিঠাপানির মাছ পাওয়া গেলেও এখন অনেক প্রজাতি বিলুপ্ত বা বিলুপ্তির পথে। নগরীর ড্রেন ও খাল দিয়ে নদীতে পড়া গৃহস্থালি বর্জ্য পানিতে জৈব দূষণ বাড়িয়ে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা কমিয়ে দিচ্ছে। কৃষিতে ব্যবহৃত সার ও কীটনাশক বৃষ্টির পানির সাথে নদীতে মিশে ইউট্রোফিকেশন সৃষ্টি করে, যা নদীর বাস্তুতান্ত্রিক ভারসাম্য নষ্ট করছে।

আইনি প্রেক্ষাপট ও করণীয়

বাংলাদেশ নদী (সংশোধন) আইন ২০১০ অনুযায়ী, নদী দূষণের জন্য দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের শাস্তির বিধান রয়েছে। সংবিধানের ১৮(ক) ধারায় রাষ্ট্রকে প্রকৃতি, বন, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি সংরক্ষণের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। নদী দূষণ নিয়ন্ত্রণে কিছু তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। শিল্পবর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা বন্ধ করতে কঠোর নজরদারি ও আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। যেসব শিল্পকারখানায় বর্জ্য শোধনাগার নেই, তাদের দ্রুত স্থাপনে বাধ্য করতে হবে এবং নিয়মিত পরিবেশগত পরিদর্শন চালাতে হবে। নদীর তীরে অবৈধভাবে ফেলা কঠিন বর্জ্য ও প্লাস্টিক অপসারণে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো প্রয়োজন।

দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ

নদী দূষণ কমানোর জন্য সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পাঞ্চলে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার স্থাপন এবং নগরাঞ্চলে আধুনিক স্যুয়েজ শোধনাগার নির্মাণ করতে হবে। কৃষিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কমানো এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি পদ্ধতি উৎসাহিত করতে হবে। নদীর তীরের অবৈধ দখলদারিত্ব অপসারণ করে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে। নদীর পানির গুণাগুণ পর্যবেক্ষণের জন্য বাস্তব সময়ে নজরদারি কেন্দ্র স্থাপন এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোও প্রয়োজন।

বাংলাদেশের নদীমাতৃক সবুজ প্রান্তর আজ শোকাহত, কারণ আমাদের জীবন ও সংস্কৃতির মাতা হিসেবে পরিচিত নদীগুলো আজ মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। রুপালি ইলিশের আবাসস্থল আজ আলকাতরার মতো কালো তরলে ভরে গেছে, আর শিল্পের নির্মম পদচারণায় প্রকৃতির কোমলতা ম্লান হয়ে পড়েছে। যেমন ফুসফুস ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না, তেমনি নদী ছাড়া দেশকে বাঁচানো সম্ভব নয়।