মুক্তিযুদ্ধ শেষ হলেও শেষ হয়নি নারীর জীবনসংগ্রাম। সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর পরিচালিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে শহীদজায়াদের জীবনযুদ্ধের চিত্র। গবেষণার শিরোনাম 'মুক্তিযুদ্ধে পরিবার-প্রধানহারা নারীর জীবনসংগ্রাম'।
নেত্রকোনার সাজেদা এক সময় স্বামীসহ কৃষিজীবী পরিবারে মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে স্বামী নিহত হওয়ার পর তার ভাসুর জমি ও বাড়ি দখল করে নেয়। স্বাধীনতার ১৫ বছর পর মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয়দের সহায়তায় তিনি স্বামীর ভিটায় একটু জায়গা পান। শহীদজায়া সাজেদা বলেন, 'দেশের যুদ্ধ শেষ হয়ে গিয়েছিল, আমার যুদ্ধ চলতেই থাকলো। আমি কোথাও গিয়ে আশ্রয় পাইনি। নিজেকে খেয়ে পরে বাঁচতে হলে লোকের ঘরে কাজ করে খাওয়া ছাড়া কোনো পথ আমার ছিল না। দিনে কাজ করেছি, রাতে কেঁদে বালিশ ভিজিয়েছি।'
মুক্তিযুদ্ধে উপার্জনক্ষম পরিবার প্রধানকে হারিয়েছিলেন বিপুল সংখ্যক শহীদজায়া। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে কীভাবে এই নারীরা সংসারের হাল ধরতে বাধ্য হন, সন্তান-সন্ততিদের সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন বা করতে ব্যর্থ হন—তা অনুধাবনে এই গবেষণা পরিচালনা করে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। গবেষণার মুখ্য গবেষক ড. রেজিনা বেগম, যিনি জাদুঘরের গবেষণা ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপক।
গবেষণার প্রাথমিক উপস্থাপনা
শনিবার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সেমিনার হলে গবেষক ড. রেজিনা বেগম গবেষণাকর্মটির প্রাথমিক পর্যায় উপস্থাপন করেন। প্যানেল আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন শহীদজায়া শ্যমলী নাসরিন চৌধুরী, অধ্যাপক মেঘনা গুহঠাকুরতা এবং অধ্যাপক আবু মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন।
গবেষণাটি ১৩০ জন শহীদজায়ার ওপর পরিচালিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধকালীন তাদের কেউ একক পরিবারে, কেউ যৌথ পরিবারে বসবাস করতেন। শহীদদের মধ্যে কৃষক, ব্যবসায়ী, চাকুরীজীবী, শিক্ষক, ডাক্তার, মেকানিক, রিকশাচালকও ছিলেন। যুদ্ধের সময় কোনো কোনো নারী অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। তারা পরিবারপ্রধানকে হারিয়ে কেউ শরণার্থী ক্যাম্পে, কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেন। যুদ্ধের পর শুরু হয় তাদের আরেক লড়াই।
গবেষকের বক্তব্য
ড. রেজিনা বেগম বলেন, 'স্বামীর মৃত্যুর পর অনেক শহীদজায়া তার স্বামীর বাড়িতে জায়গা পায়নি। তার সম্পত্তির উত্তরাধিকার হতে পারেননি। বিপুল সংখ্যক নারী পরিবারের প্রধান বা উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে অনিশ্চিত জীবনের মুখোমুখি হন। এই শহীদজায়াদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ অর্থ উপার্জনে সম্পৃক্ত ছিলেন না, পাশাপাশি তাদের বয়স এবং শিক্ষাগত যোগ্যতায় বিবেচনায়ও তারা প্রান্তিক গোষ্ঠীর অন্তর্গত ছিলেন।'
সেমিনারে বক্তব্য
সেমিনারে সূচনা বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি সারা যাকের বলেন, 'আমাদের জীবনে নানাভাবে মুক্তিযুদ্ধ প্রভাবিত করেছে। মুক্তিযুদ্ধে অনেক পরিবারে উপার্জনক্ষম প্রধান ব্যক্তিটিই মারা গেছেন। সেই পরিবারের যে জীবন-সংগ্রাম, তা উঠে আসছে এই গবেষণাপত্রে।'
জাদুঘরের আরেক ট্রাস্টি সারওয়ার আলী বলেন, 'মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরতে গবেষণার কোনো বিকল্প নেই। এটি প্রাথমিক গবেষণাপত্র। এটিকে সমৃদ্ধ করা গেলে মুক্তিযুদ্ধের একটা অনালোচিত অধ্যায় নতুন চিন্তার খোরাক যোগাবে। মুক্তিযুদ্ধ যে ১৬ ডিসেম্বর শেষ হয়ে যায়নি, বরং যুদ্ধে স্বামীহারা কিংবা পরিবারের প্রধান ব্যক্তিটিকে হারিয়ে যে অথৈ লড়াই করেছেন আমাদের মায়েরা, তা উঠে আসবে।'
শহীদজায়ার বক্তব্য
শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী বলেন, 'সেসব লড়াকু মায়েদের কথা আমরা মনে রাখিনি। গবেষককে ধন্যবাদ জানাই, তিনি তাদের সেই অজানা কথা তুলে এনেছেন। এ ধরনের গবেষণা আরও বড় পরিসরে হওয়া জরুরি। মুক্তিযুদ্ধকে যারা ভুলে যেতে চায়, তাদের বুঝতে হবে মুক্তিযুদ্ধ এই দেশের অস্তিত্ব।'
অধ্যাপক মেঘনা গুহঠাকুরতা বলেন, 'এই গবেষণা থেকে আরও অনেক গবেষণার দ্বার খুলে যাবে।'
গবেষণাপত্রটিকে সমৃদ্ধ করতে নানা রকম পরামর্শ দেন অধ্যাপক আবু মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, 'এই গবেষণাটি একটি প্রাথমিক ভিত্তি হতে পারে। এটি এখনো বই আকারে প্রকাশ হয়নি, তাই এটি প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। এই কাজটি একটি নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে। এটি আরও বড় পরিসরে করা উচিত।'



