সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কেন্দ্রিক হত্যা মামলায় জামিন না দেওয়ার ঘটনায় তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, নতুন বাংলাদেশ গঠন ও অবিচার রোধে এই অভ্যুত্থান হয়েছিল, কিন্তু বর্তমানে বিচারকদের জামিন দিতে ১০ বার চিন্তা করতে হয়।
জাতীয় কনভেনশনে বক্তব্য
রোববার বিকেলে রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশে (আইডিইবি) এনসিপির সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি আয়োজিত দিনব্যাপী জাতীয় কনভেনশনের তৃতীয় পর্বে তিনি এ কথা বলেন। ‘জ্বালানি, অর্থনীতি, সংস্কার ও গণভোটবিষয়ক জাতীয় কনভেনশন’ শীর্ষক এই কনভেনশনে তৃতীয় পর্বের বিষয় ছিল ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার: বর্তমান ঝুঁকি ও করণীয়’।
মানবাধিকারের সর্বজনীনতা
সারা হোসেন উপস্থিত নেতা-কর্মী ও দর্শকদের উদ্দেশে প্রশ্ন রাখেন, মানবাধিকার কি শুধু নিজের মতাদর্শ, দল, গোষ্ঠী, লিঙ্গ ও ধর্মের মানুষের জন্য নাকি সবার জন্য? তিনি বলেন, যাঁরা আমার মতাদর্শ ধারণ করেন না, তাঁদের মানবাধিকারকে আমরা শ্রদ্ধা করব কি না? মানবাধিকার সর্বজনীন, অবিচ্ছেদ্য ও অবিভাজনীয়। এটি শুধু বাকস্বাধীনতা নয়, জীবনের অধিকার, গুম ও নির্যাতন থেকে মুক্তির অধিকার, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকারও এর অন্তর্ভুক্ত। প্রতিটি অধিকার সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য, সেখানে রাজনৈতিক মতাদর্শ কোনো ইস্যু হতে পারে না।
বর্তমান পরিস্থিতি
সাবেক গুম কমিশনের সদস্য নাবিলা ইদ্রিসের বর্ণনার প্রসঙ্গ টেনে সারা হোসেন বলেন, আওয়ামী লীগ শাসনামলে আটক ব্যক্তিদের দীর্ঘদিন পর আদালতে আনা হতো এবং শেষ পর্যন্ত জামিন পেতেন। কিন্তু বর্তমানে জামিনই শুরু হচ্ছে না। যাঁরা ভিন্ন মতাদর্শের, তাঁদের জামিন হচ্ছে না। তিনি প্রশ্ন রাখেন, এর সঙ্গে কি উপস্থিতরা একমত?
রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি
সারা হোসেন উল্লেখ করেন, জুলাই অভ্যুত্থান সংক্রান্ত মামলায় জামিন না দেওয়ার যুক্তি হিসেবে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, 'চার্জশিট তো হয়ে যাবে, তদন্ত তো শেষ হবে, যখন তদন্ত শেষ হলে প্রমাণ পাওয়া যাবে, এ জন্য তাঁকে ছেড়ে দেওয়া যাবে না।' তিনি বলেন, এগুলো বাংলাদেশের জনগণের নামে করা হচ্ছে। উকিলরা উচ্চ আদালতে দাঁড়িয়ে বলছেন, জুলাইয়ের শহীদদের হত্যার বিচারের জন্য তাঁরা এভাবে তদন্ত ও বিচার চালাবেন। তিনি প্রশ্ন রাখেন, এটা কি আমাদের মাথা উঁচু করে?
জুলাই অভ্যুত্থানের লক্ষ্য
নতুন বাংলাদেশ গঠন ও অবিচার রোধে জুলাই অভ্যুত্থান হয়েছিল উল্লেখ করে সারা হোসেন বলেন, এখন এমন অবস্থা যে বিচারকদের ১০ বার চিন্তা করতে হয় কাউকে জামিন দেবেন কি না। যাঁর বিরুদ্ধে কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ দেখানো যায়নি, তাঁকে জামিন দেওয়া হচ্ছে না। তিনি বলেন, জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার সঠিকভাবে হোক, সেটা আমরা চাই। কিন্তু তদন্ত শেষ হচ্ছে না, কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ সামনে আসছে না। এটা কি জুলাই শহীদদের প্রতি প্রহসন নয়? তাঁদের কথা বলে অনেককে আটকে রাখা হচ্ছে, মনে হচ্ছে রাজনৈতিক স্বার্থে।
আইনজীবীদের নির্বাচন
সুপ্রিম কোর্ট বার কাউন্সিলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত কেউ নির্বাচন করতে পারছেন না। এ প্রসঙ্গে সারা হোসেন বলেন, তাঁরা নিয়মিত আদালতে আসেন, প্র্যাকটিস করেন। তাঁদের বিরুদ্ধে হত্যা তো দূরের কথা, কোনো অন্যায়ের অভিযোগ নেই। তাঁদের সবচেয়ে বড় অন্যায় হতে পারে, সে সময় কেউ আওয়ামী লীগের সমর্থক বা সদস্য ছিলেন। এখন তাঁরা আওয়ামী লীগ হয়ে নির্বাচনে দাঁড়াচ্ছেন না, দাঁড়াচ্ছেন আইনজীবী হিসেবে। তাঁরা দাঁড়াতে পারছেন না। তাঁদের বাকস্বাধীনতা কি রুদ্ধ করা হচ্ছে না?
আলোচনায় অংশগ্রহণ
এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া এই পর্বের আলোচনায় সভাপতিত্ব করেন। এনসিপির সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল আমিনের সঞ্চালনায় অন্যদের মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম, সাংবাদিক আশরাফ কায়সার, জাইমা ইসলাম, এনসিপির যুব সংগঠন জাতীয় যুবশক্তির সভাপতি তারিকুল ইসলাম এবং ফ্যাক্ট চেকার ও মানবাধিকারকর্মী মিনহাজ আমান বক্তব্য দেন।



