পঞ্চম আগস্টের পর চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের নতুন অধ্যায়
পঞ্চম আগস্টের পর চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের নতুন অধ্যায়

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের দৃশ্যমান অবনতি ঘটে। এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে আগের তুলনায় আরও বেশি কাছে টেনেছে চীন। দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য, পারস্পরিক আদান-প্রদানসহ নানা উপায়ে বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক অতীতের যেকোনও সময়ের চেয়ে বেড়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন দলের রাজনীতিকদের চীনে যাতায়াত বেড়েছে। নতুন সরকার আসার পরই চীনের আমন্ত্রণে রাজনৈতিক দলের নেতারা সে দেশে সফর করেন। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি নির্দিষ্ট কোনও দেশকে ঘিরে নয়। রাজনৈতিক দলের ঘনঘন সফর বরং রাজনৈতিক কৌশলের ইঙ্গিত দেয়।

৫ আগস্টের পর চীনে একাধিক সফর

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের সঙ্গে কৌশলগতভাবে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টা শুরু করে চীন। সম্পর্ক উন্নয়নের প্রথম ধাপ হিসেবে দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক বিনিময় বাড়ানো হয়। এরই অংশ হিসেবে বড় রাজনৈতিক দল বিএনপিকে আমন্ত্রণ জানায় চীনের কমিউনিস্ট পার্টি। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের তিন মাসের মাথায় বিএনপি’র চার সদস্যের একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল চীন সফর করে। এই সফরের মাধ্যমে চীনা নেতৃত্বের সঙ্গে প্রাথমিকভাবে যোগাযোগ শুরু হয় নতুন করে।

এরপর ২০২৪ সালের ২৭ নভেম্বর প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের একটি প্রতিনিধিদল চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আমন্ত্রণে বেইজিং সফর করে। ১৪ সদস্যের এই দলটির নেতৃত্ব দেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ও সাবেক সংসদ সদস্য ড. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। ওই দলে খেলাফত মজলিস, হেফাজতে ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন এবং বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির নেতারাও ছিলেন। চীনের সিনচিয়াং উইঘুর স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ পরিদর্শন ছিল এই সফরের অন্যতম প্রধান অংশ।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সফর শুরুর আগে ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন ইসলামি দলের নেতাদের সম্মানে এক বিদায় সংবর্ধনার আয়োজন করেন। সেখানে তিনি বলেন, ''বাংলাদেশ বর্তমানে এক ‘ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে’ দাঁড়িয়ে।'' তিনি ঘোষণা দেন, চীন বাংলাদেশ সরকারের অন্তর্বর্তী কর্তৃপক্ষ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং সমাজের সব স্তরের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা আরও গভীর করতে চাইছে। রাষ্ট্রদূতের ভাষায়, “এই সৌহার্দ্যপূর্ণ চীন সফরকে দুদেশের দলের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর নতুন সূচনা বলে দেখা উচিত, যাতে চীন-বাংলাদেশ সার্বিক কৌশলগত অংশীদারত্ব আগামী দিনে আরও সুসংহত হয় এবং দুই দেশের জনগণ উপকৃত হন।” অর্থাৎ, আগামী দিনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে পরিবর্তনই আসুক না কেন, চীন নিজেকে সব পক্ষের বিশ্বস্ত বন্ধু ও উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছে।

এরপর গত বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক শ্রেণির প্রতিনিধিদের নিয়ে ২২ সদস্যের একটি ‘বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী’ প্রতিনিধিদল চীন সফর করে। এই দলের নেতৃত্ব দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান। এতে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠন ছাড়াও নাগরিক ঐক্য, গণসংহতি আন্দোলন, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদ, খেলাফত মজলিস, জাতীয় দলসহ মোট আটটি দলের নেতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, ছাত্রনেতা ও সাংবাদিকরা ছিলেন। ১৩ দিনব্যাপী এই সফরে প্রতিনিধি দলটি বেইজিং, শানশি ও ইউনান প্রদেশে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তি কোম্পানি এবং অবকাঠামো প্রকল্প পরিদর্শন করে।

এর বাইরে পুনরায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে ৯ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল পাঁচ দিনের সফরে বেইজিং যায় গত বছরের ২২ জুন। বিএনপির পর একই বছরের আগস্টে চারদিনের চীন সফরে যান জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আট নেতা।

প্রথম সফরে চীনে যান সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা

গত বছরের জানুয়ারিতে সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন সরকারের পক্ষ থেকে প্রথম বিদেশ সফরে বেইজিং যান। সফরে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই’র সঙ্গে তার বৈঠক হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আগের সব সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বার্তা দেওয়া হয়। এই বৈঠকে তৌহিদ হোসেন চীনের দেওয়া ঋণের সুদের হার কমানো ও পরিশোধ সময়সীমা বাড়ানোর অনুরোধ জানান। চীন ইতিবাচক সাড়া দিয়ে মেয়াদ বাড়াতে সম্মত হয়। তৌহিদ হোসেনের ওই সফরের পর সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস চীন সফর করেন।

সরকার গঠনের পর বিএনপি নেতাদের প্রথম সফর চীনে

চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। সরকার গঠনের পর বিএনপি নেতারা প্রথম সফরে চীনে যান। গত ১৬ এপ্রিল চীন সরকারের আমন্ত্রণে চীন সফরে যান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে বিএনপির ১৯ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল। প্রতিনিধি দল ১৬ এপ্রিল চীন গেলেও ঢাকা থেকে রওনা দিয়ে মির্জা ফখরুল দলে যুক্ত হন ২০ এপ্রিল।

চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে দেশটির কমিউনিস্ট পার্টির আমন্ত্রণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে মির্জা ফখরুল ‘এক চীন’ নীতির প্রতি তার দলের এবং দেশের সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বিশ্বাস করেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নবনির্বাচিত সরকার আগামীতে চীন ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হবে।

কমিউনিস্ট পার্টি ছাড়াও চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হান চেং-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন মির্জা ফখরুল। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর চীনকে বাংলাদেশের এক বিশ্বস্ত বন্ধু ও অংশীদার হিসেবে অভিহিত করে বলেন, ''বাংলাদেশের নতুন সরকার ‘এক চীন নীতি’র প্রতি সংহতি এবং চীনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য বজায় রাখবে।''

চীন সফরে যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান

আগামী ৫ মে চীন সফরে যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। সেখানে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের কথা রয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে, এই সফরে দুই দেশের সম্পর্কের সামগ্রিক পর্যালোচনার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সহযোগিতা, উন্নয়ন প্রকল্প এবং আঞ্চলিক ইস্যুতে গুরুত্ব দেওয়া হবে। একইসঙ্গে জাতিসংঘে সভাপতি নির্বাচনে চীনের সমর্থন কামনা করবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এছাড়া চলমান অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় চীনের সহযোগিতা চাওয়া হতে পারে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু থেকে এ পর্যন্ত কখনও খারাপ হয়নি। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছর বাংলাদেশে ভারত প্রভাব খাটানোর ফলে অনেক কাজের সুযোগ হারিয়েছে চীন। ৫ আগস্টের পর তারা সেই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে নানাভাবে যোগাযোগ বাড়িয়ে।

চীনের কৌশল প্রসঙ্গে সাবেক একজন কূটনীতিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “চীনের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে বেশ কিছু সফর হয়েছে। এরকম আগে হয়নি। বিশেষ করে গত আগস্টে সরকার পতনের পর দুই দেশ আরও কাছে এসেছে— যার ফলশ্রুতিতে ওই সফরগুলো হয়েছে। তবে চীনের পরিকল্পনার সব ক্ষেত্রেই অর্থনৈতিক স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট। বাংলাদেশ যদি সেদিকে ভারসাম্য মেনে চলতে পারে, তাহলে তাতে ক্ষতি নেই।”

তিনি বলেন, ''রাজনৈতিক দলের সফরগুলোকে রাজনৈতিক হিসেবেই দেখা উচিত। কারণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে রাজনৈতিক সম্পর্ক অনেক কাজে লাগে। এছাড়া অর্থনৈতিক স্বার্থ- সম্পর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে কূটনৈতিক সম্পর্কের বাইরে রাজনৈতিক সম্পর্কের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ রয়েছে। যার ফলে চীন বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চায়।''