বাংলাদেশে শ্রম আইন বাস্তবায়ন পরিস্থিতি নিয়ে নানা মহলে ভিন্ন ভিন্ন অভিমত রয়েছে। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করা সাধারণ শ্রমিকদের মতে, তারা নতুন বা পুরোনো কোনও শ্রম আইনই বোঝেন না, জানেনও না, খবরও রাখেন না। তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন কারখানার মালিকপক্ষ বলছেন, দুই-একটি বিষয় ছাড়া নতুন শ্রম আইন তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং সর্বত্রই তা বাস্তবায়ন হচ্ছে। তবে যেখানে শতভাগ বাস্তবায়ন হয়নি, সেখানেও চেষ্টা চলছে বলে দাবি তাদের।
নতুন আইন আন্তর্জাতিক মানের কাছাকাছি
জাতীয় সংসদে পাস হওয়া বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) বিল, ২০২৬ আন্তর্জাতিক মানের কাছাকাছি এসেছে বলে ইউএনআই, গ্লোবাল ইউনিয়নসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা স্বাগত জানিয়েছে। যদিও কিছু পক্ষ এর কার্যকারিতা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।
শ্রমিকপক্ষের বক্তব্য ভিন্ন
নতুন শ্রম আইন সম্পর্কে শ্রমিকপক্ষের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের মতে, যেহেতু আইনটি মালিকদের পছন্দ হয়েছে, সেহেতু এটি শ্রমিকদের বিপক্ষে গেছে। যে আইনে মালিক খুশি হয়, সে আইনে শ্রমিকের কল্যাণ থাকে না—এমন ধারণাও তুলে ধরেন তারা। তাদের অভিযোগ, নতুন আইনে শ্রমিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করা হয়েছে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশও এতে প্রতিফলিত হয়নি।
আইনের মূল বৈশিষ্ট্য
জানা গেছে, চলতি বছরের ৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে পাস হওয়া বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) বিল, ২০২৬-এর মাধ্যমে শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষা, ট্রেড ইউনিয়ন গঠন সহজীকরণ, মাতৃত্বকালীন সুবিধা বৃদ্ধি এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা জোরদারের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) মানদণ্ড অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ, যৌন হয়রানি প্রতিরোধ এবং জোরপূর্বক শ্রম নিষিদ্ধের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও এতে যুক্ত হয়েছে।
২০২৬ সালের এপ্রিলে পাস হওয়া এই আইনটি পূর্বের ২০২৫ সালের অধ্যাদেশকে পূর্ণাঙ্গ আইনে রূপান্তর করেছে। এর লক্ষ্য আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমসংক্রান্ত শর্ত পূরণ করা। নতুন আইনে ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের শর্ত শিথিল করে ছোট প্রতিষ্ঠানে ২০ জন শ্রমিকের সম্মতিতেই ইউনিয়ন করার সুযোগ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় সামাজিক সংলাপ ফোরাম এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি কর্তৃপক্ষ গঠনের বিধান রাখা হয়েছে।
মাতৃত্বকালীন ছুটি ও নিরাপত্তা
আইনে মাতৃত্বকালীন ছুটি ১২০ দিন নির্ধারণ, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিতকরণ, কল্যাণ তহবিল গঠন, যৌন হয়রানির সংজ্ঞা নির্ধারণ এবং কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এছাড়া জাতি, লিঙ্গ, ধর্ম, অক্ষমতা বা রাজনৈতিক মতামতের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শ্রমিকদের ‘ব্ল্যাকলিস্টিং’, জোরপূর্বক শ্রম এবং ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের হয়রানি বন্ধেও আইনি ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। শ্রমিকদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার বিধানও যুক্ত হয়েছে।
শ্রমিকপক্ষের অভিযোগ
তবে শ্রমিকপক্ষের অভিযোগ, নতুন আইনে একটি কারখানায় পাঁচটি ইউনিয়নের পরিবর্তে তিনটি ইউনিয়নের সীমা নির্ধারণ করায় তাদের অধিকার সংকুচিত হয়েছে। এছাড়া শ্রমিকদের আন্দোলনকে অবৈধ ঘোষণার মাধ্যমে চাকরিচ্যুত করার বিধান গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করেছে বলেও দাবি তাদের। ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়ন নিয়েও মালিকপক্ষের গড়িমসির অভিযোগ রয়েছে।
মালিকপক্ষের বক্তব্য
অপরদিকে, মালিকপক্ষের মতে, শ্রমিকের সংজ্ঞা নিয়ে কিছু আপত্তি ছাড়া আইনটির প্রতি তাদের সমর্থন রয়েছে। তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের ন্যায্য দাম না পাওয়ার কারণে কিছু কারখানায় ১২ হাজার ৫০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়নে সমস্যা হচ্ছে।
শ্রম আইনের সংজ্ঞা ও প্রযোজ্যতা
বাংলাদেশ শ্রম আইনের সংজ্ঞা অনুযায়ী, যেকোনও প্রতিষ্ঠানে মজুরির বিনিময়ে সরাসরি বা ঠিকাদারের মাধ্যমে কাজ করা দক্ষ, অদক্ষ, কায়িক বা কারিগরি শ্রমিক—সবাই শ্রমিক হিসেবে বিবেচিত হবেন। বদলি, শিক্ষানবিশ, অস্থায়ী, স্থায়ী ও মৌসুমি কর্মীরাও এর অন্তর্ভুক্ত। তবে ব্যবস্থাপনা বা প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা এর বাইরে থাকবেন।
অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জ
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে গার্মেন্টস খাতে শ্রম আইন বাস্তবায়ন আংশিক হলেও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে পরিস্থিতি ভিন্ন। গৃহশ্রমিক, দোকান শ্রমিক ও পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে এ আইন সম্পর্কে সচেতনতা কম এবং তারা এর সুবিধাও পাচ্ছেন না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শ্রম আইন সংশোধন ও আধুনিকায়নে অগ্রগতি হলেও বাস্তবায়নে এখনও বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দেশের প্রায় ৮৫ শতাংশ শ্রমিক অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করায় সেখানে আইনের প্রয়োগ সীমিত। আউটসোর্সিং ও দৈনিক মজুরি ভিত্তিক শ্রমিকদের চাকরির নিরাপত্তা এবং ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ।
সিপিডির মতামত
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির মতে, কার্যকর শ্রম আইন বাস্তবায়নে সরকার, মালিক, শ্রমিক এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর সমন্বয় জরুরি। শ্রমিকদের নিরাপত্তা, ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার সহজীকরণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক-অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের বৈষম্য কমানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
নেতৃবৃন্দের বক্তব্য
বিকেএমইএর সভাপতি মো. হাতেম বলেন, ‘শ্রমিকের সংজ্ঞা ছাড়া নতুন আইনের সব দিক বাস্তবায়নে মালিকপক্ষ কাজ করছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম কম পাওয়ায় কিছু ক্ষেত্রে ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়নে বাধা তৈরি হচ্ছে।’
গার্মেন্টস শ্রমিক নেত্রী মোশরেফা মিশু বলেন, ‘যে শ্রম আইনে মালিকরা খুশি হন, সে আইন শ্রমিকদের কল্যাণ বয়ে আনে না। এই আইনে শ্রমিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করা হয়েছে। আমরা শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন চাই।’
সব মিলিয়ে বলা যায়, আইন সংশোধনে অগ্রগতি হলেও মাঠপর্যায়ে এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেই রয়ে গেছে।



