ফরিদপুরে আলোচিত ট্রিপল মার্ডারের ঘটনায় রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় একমাত্র অভিযুক্ত যুবক আকাশ মোল্লাকে (২৫) গ্রেফতার করা হয়েছে। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) দুপুর ২টায় ফরিদপুর পুলিশ সুপার কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান পুলিশ সুপার নজরুল ইসলাম।
গ্রেফতার ও আলামত জব্দ
ফরিদপুর র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) সহযোগিতায় দ্রুত সময়ের মধ্যে ট্রিপল হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন সম্ভব হয়েছে বলে তিনি জানান। যৌথ অভিযানে ভোরে বাড়ির পাশের একটি কলাবাগান থেকে হত্যাকারী আকাশ মোল্লাকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত কোদালটি আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের বিবরণ
সোমবার (২৭ এপ্রিল) রাত ৯টার দিকে জেলা সদরের আলিয়াবাদ ইউনিয়নের গদাধরডাঙ্গী গ্রামে তিন জনকে উপর্যুপরিভাবে কোদাল দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে আকাশ মোল্লা। সে ওই গ্রামের হারুন মোল্লার ছেলে। হামলায় তার দাদি আমেনা বেগম (৮০) ও ফুফু রাহেলা বেগম (৮০) নিহত হন। তাদের ডাকচিৎকারে এগিয়ে গেলে প্রতিবেশী রিকশাচালক কাবুল চৌধুরীকে (৩৮) উপর্যুপরিভাবে কুপিয়ে হত্যা করে। এ ছাড়া হামলায় রিয়াজুল শেখ ও আরজিনা বেগম নামে আরও দুই জন আহত হন। এ ঘটনায় সকালে নিহত কাবুলের স্ত্রী কোহিনুর বেগম বাদী হয়ে আকাশ মোল্লাকে একমাত্র আসামি করে কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেছেন।
নৃশংস হত্যাকাণ্ড
এই হত্যাকাণ্ডকে নৃশংস হিসেবে উল্লেখ করে বর্ণনা দেন পুলিশ সুপার। তিনি বলেন, নিহত কাবুল চৌধুরী রাতে খাওয়া-দাওয়া শেষে চা খাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হন এবং রিয়াজুল নামে একজনের সঙ্গে দেখা হলে তারা খুশির বাজারে যাওয়ার উদ্দেশে রওনা হন। এরপর রাত ৯টার সময় তারা হারুন মোল্লার বাড়ি থেকে চিৎকার শুনতে পান; তখন স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তির সাথে নিহত কাবুল হোসেন ও রিয়াজুল বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করেন। তখন তারা বিভৎস দৃশ্য দেখতে পান, আকাশ তার দাদি ও ফুফুকে কোদাল দিয়ে উপর্যুপরিভাবে আঘাত করছে। এ সময় কাবুল চিৎকার দিলে আসামি আকাশ মোল্লা তার হাতে থাকা কোদাল দিয়ে উপস্থিতদের আঘাত শুরু করে। এ সময় কাবুল ঘটনাস্থলেই মারা যান। এ ছাড়া আকাশের কোদালের আঘাতে জখম হয় রিয়াজুল শেখ ও আরজিনা বেগম নামে দুই জন। তাদেরকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
হত্যার কারণ
সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকাণ্ডের কারণ হিসেবে উল্লেখ করে ও আসামির বরাত দিয়ে পুলিশ সুপার বলেন, 'তিনি (আকাশ) আমাদের বলেছেন যে, তার আশঙ্কা ছিল তাকে সবাই মিলে মেরে ফেলবে এবং সাবালক বা প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ায় তাকে বিয়ে দেওয়া হয়নি; এ কারণে তার পরিবারের ওপর ক্ষুব্ধ ছিল। এই ক্ষোভ ও আক্রোশের বশীভূত হয়ে সে হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছে বলে আমাদের কাছে প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে।'
মানসিক অবস্থা
হামলাকারী আকাশ মোল্লা মানসিক বিকারগ্রস্ত ছিলেন কি না সে বিষয়ে পুলিশ সুপার বলেন, 'আমরা প্রাথমিক তদন্ত ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছি, আকাশ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিল। মানসিক অসুস্থতার ওষুধ সেবন করতো। এ ছাড়া এই আকাশ ফরিদপুর টিবি হাসপাতালে (সরকারি বক্ষব্যাধি হাসপাতাল ও ক্লিনিক) চাকরি করতেন এবং বিভিন্ন কারণে কয়েকবছর আগে তাকে ওখান থেকে চাকরিচ্যুত করা হয়। এরপর থেকে সে মূলত এলাকাতেই থাকতো এবং সে একাই চলাফেরা করতো। এ ছাড়া আক্রমণকারী হিসেবে এলাকাবাসী তাকে এড়িয়ে চলতো।'
তবে গ্রেফতারের সময় আকাশ সুস্থ-স্বাভাবিক ছিল- দাবি করে পুলিশ সুপার বলেন, 'আমরা তাকে সুস্থ-স্বাভাবিক দেখেছি, তবে তিনি মানসিক ভারসাম্যহীন কি না সেটা চিকিৎসকরা বলতে পারবেন। তাকে যখন গ্রেফতার করা হয়, তখন আমাদের কাছে স্বাভাবিকই মনে হয়েছে।'
আইনি প্রক্রিয়া
পুলিশ সুপার নজরুল ইসলাম আরও বলেন, 'আসামি আকাশকে আমরা আদালতে সোপর্দ করবো এবং প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শেষে কারাগারে পাঠানো হবে।' এ সময় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) শামছুল আজম, ফরিদপুর র্যাব ক্যাম্পের দায়িত্বরত সহকারী পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান, কোতোয়ালি থানার ওসি শহিদুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।



