যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধের কারণে তেল রপ্তানি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম সংকটে পড়েছে ইরান। দেশে তেলের মজুত বেড়ে যাওয়ায় তা সংরক্ষণের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে তেহরান। পরিস্থিতির চাপে পড়ে দেশটি এখন এমন সব পরিত্যক্ত স্থানে তেল রাখার চেষ্টা করছে, যেগুলোকে শিল্প খাতে বাতিল গুদাম হিসেবে অভিহিত করা হয়। একই সঙ্গে, অপরিশোধিত তেল চীনের বাজারে পাঠাতে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে রেলপথ ব্যবহারেরও চেষ্টা চালাচ্ছে দেশটি। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি নিয়ে সৃষ্ট অচলাবস্থায় ইরানের তেল অবকাঠামো এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারে কে আগে নতি স্বীকার করে, তা দেখার জন্যই চলছে এই অদৃশ্য লড়াই।
অবরোধের আগে থেকেই সংকট
গত ১৩ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ আরোপ করার আগে থেকেই দেশটি তেলের মজুত নিয়ে হিমশিম খাচ্ছিল। অ্যানালাইটিক্স প্রতিষ্ঠান কেপলার-এর তথ্য অনুযায়ী, ১ এপ্রিল থেকে ১৩ এপ্রিল ইরান প্রতিদিন গড়ে ২১ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও কনডেনসেট লোড করতো। অবরোধের পর ১৪ এপ্রিল থেকে ২৩ এপ্রিল এই হার কমে দৈনিক ৫ লাখ ৬৭ হাজার ব্যারেলে নেমে এসেছে। যুদ্ধের আগের পরিস্থিতিতে ইরান দৈনিক গড়ে ২০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করতো।
উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে ইরান
রপ্তানি পথ বন্ধ থাকায় ইরানের জাতীয় তেল কোম্পানি এখন বাধ্য হয়ে উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে। কেপলার-এর তথ্য অনুসারে, যদি এই অবরোধ অব্যাহত থাকে, তবে মে মাসের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে ইরানের তেল উৎপাদন বর্তমান থেকে অর্ধেকে নেমে অর্থাৎ ১২ লাখ থেকে ১৩ লাখ ব্যারেলে ঠেকতে পারে।
পরিত্যক্ত ট্যাংক ও ভাসমান ট্যাংকার
মজুত সক্ষমতা ফুরিয়ে আসছে বলে অপারেটররা এখন নতুন পদ্ধতির দিকে ঝুঁকছে। ইরানের আহভাজ ও আসালুইয়ের মতো দক্ষিণাঞ্চলীয় তেল কেন্দ্রগুলোতে থাকা পরিত্যক্ত ট্যাংক ও কন্টেইনারে তেল রাখার কাজ শুরু হয়েছে। এক ইরানি তেল কর্মকর্তা জানান, অনেক ট্যাঙ্ক নাজুক অবস্থার কারণে এতদিন অব্যবহৃত ছিল। এছাড়া সাগরে ভাসমান ট্যাঙ্কারেও তেল রাখার চেষ্টা চলছে। তবে এসব ট্যাঙ্কার এখন বিশ্ববাজারে পৌঁছাতে পারছে না।
রেলপথে চীনে তেল পাঠানোর চেষ্টা
ইরানি তেল রপ্তানিকারক ইউনিয়নের মুখপাত্র হামিদ হোসেইনি জানান, তারা রেলপথ ব্যবহার করে চীনে তেল পাঠানোর চেষ্টা করছেন। তেহরান থেকে চীনের ইউউ এবং শিয়ান শহর পর্যন্ত রেল সংযোগ থাকলেও এটি মোটেও সাশ্রয়ী নয়। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্বালানি নীতি বিশেষজ্ঞ এরিকা ডাউনস বলেন, 'দুঃসময়ে মরিয়া পদক্ষেপ নিতে হয়। কিন্তু পরিবহন খরচ বেশি হওয়ায় এটি কোনও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।'
উৎপাদন বন্ধের ঝুঁকি
হঠাৎ তেল উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া বা কমিয়ে দেওয়া ইরানের পুরোনো তেল ক্ষেত্রগুলোর জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠান রাইস্ট্যাড এনার্জির মতে, ইরানের প্রায় অর্ধেক তেলক্ষেত্রের চাপ কম বা ভূতাত্ত্বিকভাবে নাজুক। দীর্ঘ সময় উৎপাদন বন্ধ থাকলে এগুলোতে স্থায়ীভাবে উৎপাদন ক্ষমতা হারানোর শঙ্কা রয়েছে।
আলোচনার টেবিলে প্রভাব
ইরান আশা করছে, এই অর্থনৈতিক দুর্ভোগ তাদের অবরোধ তুলে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনার টেবিলে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। চ্যাথাম হাউজের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিল বলেন, 'উৎপাদন বন্ধের চাপ আলোচনার গতি বাড়াতে পারে।' তবে প্রথম দফার আলোচনা কোনও সাফল্য ছাড়াই শেষ হয়েছে এবং ইরান দ্বিতীয় দফায় বসতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ইরান বর্তমানে আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের কাছে একটি প্রস্তাব দিয়েছে, যেখানে তারা হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করার বিনিময়ে যুদ্ধ শেষ করা এবং মার্কিন অবরোধ তুলে নেওয়ার দাবি জানিয়েছে। তবে সোমবার হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানিয়েছেন, ইরানের এই প্রস্তাব নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার জাতীয় নিরাপত্তা দলের সঙ্গে আলোচনা করেছেন এবং তার কঠোর অবস্থান এখনও অপরিবর্তিত।
ট্যাংক ভর্তি ও দাম বাড়া
অনেকে মনে করছেন, দুই সপ্তাহের কম সময়ের মধ্যে ইরানের তেল মজুতের জায়গা পুরোপুরি ফুরিয়ে যেতে পারে, যাকে শিল্প পরিভাষায় বলা হয় 'ট্যাঙ্ক ভর্তি'। বর্তমানে ইরানের স্থলভাগের তেল মজুতের পরিমাণ ৪৬ লাখ ব্যারেল বেড়ে প্রায় ৪৯ মিলিয়ন ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে। এর মোট সক্ষমতা ৯৫ মিলিয়ন ব্যারেল হলেও ভৌগোলিক ও নিরাপত্তা সীমাবদ্ধতায় এর বড় অংশই ব্যবহারযোগ্য নয়। এদিকে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে। সোমবার আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারের দাম প্রায় ৩ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১০৮.২৩ ডলারে পৌঁছেছে। জ্বালানির এই সংকট সাধারণ ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
হুমকি ও প্রতিক্রিয়া
ট্রাম্প অবশ্য জানিয়েছেন, ইরানের তেল অবকাঠামো বিকল হতে বড়জোর তিন দিন সময় লাগতে পারে। অন্যদিকে, ইরানের এক জ্বালানি কর্মকর্তা সোশ্যাল মিডিয়ায় হুমকি দিয়ে বলেছেন, অবরোধ চলাকালীন ইরানের কোনও তেলকূপ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তারা এর দাঁতভাঙা জবাব দেবে। সূত্র: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।



