রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যা মামলায় প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। রায় ঘোষণাকালে আদালত পর্যবেক্ষণে বলেছেন, শিশুদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা একটি সভ্য ও মানবিক রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব।
রায়ের বিবরণ
রবিবার (৭ জুন) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেহীন এ রায় ঘোষণা করেন। রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের মামলাটি কেবল একটি ফৌজদারি বিচারিক কার্যক্রম নয়; এটি সমাজের বিবেক, মানবতা, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং আইনের শাসনের প্রতি এক গভীর ও কঠিন পরীক্ষা। একটি নিষ্পাপ শিশুর জীবন নির্মমভাবে নিভিয়ে দেওয়ার অভিযোগে দায়ের হওয়া এ মামলার প্রতিটি পৃষ্ঠা বেদনা, ক্ষোভ, উদ্বেগ এবং ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় পরিপূর্ণ।
শিশু নির্যাতনের সামাজিক প্রভাব
তিনি বলেন, যখন কোনও শিশু যৌন নির্যাতন, সহিংসতা কিংবা হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের শিকার হয়, তখন তা শুধু একটি পরিবারকে নয়, সমগ্র সমাজকে গভীরভাবে আহত করে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
বিচারক উল্লেখ করেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অধীনে গঠিত এই ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে ১ হাজার ৮০০-এর বেশি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এসব মামলার প্রতিটির পেছনে রয়েছে শিশুদের অসহনীয় যন্ত্রণা, পরিবারের দীর্ঘশ্বাস এবং ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় থাকা মানুষের প্রত্যাশা। সেই প্রেক্ষাপটে শিশু রামিসার মামলাটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে, কারণ এ মামলায় তদন্ত, সাক্ষ্যগ্রহণ ও বিচারিক কার্যক্রম তুলনামূলক দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে।
তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার প্রশংসা
পর্যবেক্ষণে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, তদন্তকারী সংস্থা অল্প সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করে আদালতে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। একইভাবে প্রসিকিউশনও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের দ্রুত আদালতে উপস্থাপন করে বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তদন্তকারী কর্মকর্তা, প্রসিকিউশন এবং সংশ্লিষ্ট সবার আন্তরিকতা ও পেশাদারিত্ব প্রশংসার দাবিদার।
আদালত আশা প্রকাশ করে বলেন, শিশু রামিসার মামলার মতো দ্রুত, দক্ষ, নিরপেক্ষ ও মানসম্মত তদন্ত এবং বিচারিক কার্যক্রম ভবিষ্যতে শিশু নির্যাতন ও সহিংসতাসংক্রান্ত অন্যান্য মামলার ক্ষেত্রেও অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হবে। ভুক্তভোগী শিশু ও তাদের পরিবার যেন দীর্ঘসূত্রিতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে না থাকে, সে লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ একই ধরনের দায়িত্বশীলতা ও দক্ষতার পরিচয় দেবেন।
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার শর্ত
রায়ের পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, ন্যায়সঙ্গত বিচার কেবল আদালতের একক প্রচেষ্টায় সম্ভব নয়। তদন্তকারী সংস্থা, প্রসিকিউশন, ডিফেন্স, সাক্ষী এবং বিচার ব্যবস্থার সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্বশীল অংশগ্রহণের মাধ্যমেই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
বিচারক বলেন, আদালতের দায়িত্ব আবেগ দিয়ে নয়, আইন, প্রমাণ ও ন্যায়বিচারের চিরন্তন নীতিমালার আলোকে সত্য উদ্ঘাটন করা। সেই বিবেচনায় আদালত অত্যন্ত সতর্কতা, সংবেদনশীলতা ও বিচারিক নিরপেক্ষতার সঙ্গে সাক্ষ্য-প্রমাণ, আলামত, চিকিৎসা প্রতিবেদন এবং মামলার সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে এ রায় দিয়েছেন।



