ফেনীতে সড়ক দুর্ঘটনায় অ্যাম্বুলেন্স চালক ও তাঁর ছেলে নিহত
ফেনীর সোনাগাজী উপজেলায় মর্মান্তিক এক সড়ক দুর্ঘটনায় অ্যাম্বুলেন্স চালক নুর আলম ও তাঁর একমাত্র ছেলে নুর হাসান নীরব নিহত হয়েছেন। এই ঘটনায় নুর আলমের স্ত্রী নাসিমা আক্তার (৩৬) ও তাঁর শাশুড়ি ফাতেমা খাতুন (৭৫) শোকে পাগলপ্রায়। দুই নারীই হারিয়েছেন তাঁদের একমাত্র ছেলেকে। নুর আলম ছিলেন ফাতেমা খাতুনের একমাত্র সন্তান। একমাত্র সন্তান হারানোর শোকে দুই নারী বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন।
দুর্ঘটনার বিবরণ
গতকাল মঙ্গলবার সকালে নুর আলমের মোটরসাইকেল মহাসড়কে ইউটার্ন নেওয়ার সময় চট্টগ্রামগামী ‘দাউদকান্দি এক্সপ্রেস’ বাসের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। এতে মোটরসাইকেলে থাকা নুর আলম, তাঁর ছেলে নুর হাসান নীরব ও ভাগনে আফজাল হোসেন মিঠু গুরুতর আহত হন। ফেনী জেনারেল হাসপাতালে নেওয়ার পর নুর আলমকে মৃত ঘোষণা করা হয়। পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে বারইয়ারহাট এলাকায় নুর হাসান নীরবের মৃত্যু হয়। গুরুতর আহত আফজাল হোসেন মিঠু বর্তমানে চট্টগ্রামের সিআরবি হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন আছেন।
পরিবারের শোক
আজ বুধবার সকালে ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার মঙ্গলকান্দি ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামের শাহী উল্যাহ বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বামী ও ছেলেকে হারিয়ে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন নাসিমা আক্তার। তিনি ছেলে ও স্বামীকে হারিয়ে বিলাপ করে কাঁদছেন। তাঁর শাশুড়ি ফাতেমা খাতুন বয়সের ভারে নুব্জ্য। ৭৫ বছর বয়সে একমাত্র ছেলেসন্তান ও নাতিকে হারিয়ে শোকে বাক্রূদ্ধ হয়ে পড়েছেন। ১০ বছর আগে যক্ষায় আক্রান্ত হয়ে তাঁর স্বামী মারা যান। এবার একসঙ্গে মারা গেলেন তাঁর ছেলে ও নাতি। সেই সঙ্গে বাড়িটি একরকম পুরুষশূন্যও হয়ে পড়ল।
নুর আলমের মেয়ের বক্তব্য
নুর আলমের মেয়ে তাহমিনা সুলতানা বলেন, ‘সোমবার দুপুরে বাবার সঙ্গে একসঙ্গে ভাত খেয়েছিলাম। বাবার নাইট শিফটে ডিউটি থাকায় রাতে বাবার খাবার বক্সে করে দিয়েছিলাম। সেটি ছিল বাবার সঙ্গে শেষ দেখা। মঙ্গলবার সকালে আমার ভাই নুর হাসনাত নীরব ও ফুফাতো ভাই প্রবাসী আফজাল হোসেন একসঙ্গে বাবার হাসপাতালে যায়। সেখান থেকে বাবার বাইক নিয়ে তারা তিনজন লেমুয়ায় ফুফুর বাড়িতে দাওয়াত খেতে যাওয়ার পথে দুর্ঘটনা ঘটে। একটি দুর্ঘটনায় পুরো পরিবার এলোমেলো হয়ে পড়েছে।’
তাহমিনা আরও বলেন, ‘আমার একটিমাত্র ভাই। স্থানীয় বক্তারমুন্সী মোয়াজ্জেম হোসেন উচ্চবিদ্যালয় থেকে নীরব এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করলেও উত্তীর্ণ হতে পারেনি। মা আশা করেছিলেন, ছেলেকে বিদেশে পাঠালে সে সংসারের হাল ধরবে। কিন্তু বয়স কম থাকায় তার ড্রাইভিং লাইসেন্স বানাতে পারেনি। একসঙ্গে বাবা ও ভাই আমাদের ছেড়ে চলে গেল।’
অ্যাম্বুলেন্সেই বাড়ি ফিরলেন নুর আলম
নুর আলম কর্মজীবনে বহু রোগীকে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছেন। মরদেহও বহন করেছেন অসংখ্য। কিন্তু গতকাল রাতে সেই অ্যাম্বুলেন্সই তাঁর নিজের নিথর দেহ বাড়িতে নিয়ে এল। সঙ্গে ছিল একমাত্র ছেলে নুর হাসনাত নীরবের মরদেহও। গতকাল সন্ধ্যায় নুর আলমের সহকর্মীরা নিজেদের অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে তাঁর লাশের সঙ্গে বাড়িতে আসেন। দুই ডজন অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনের শব্দে জনাকীর্ণ গ্রাম জেগে ওঠে। দুই দফা জানাজা শেষে রাতে রাজাপুর গ্রামের শাহী উল্যাহ বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি দুটি কবরে শায়িত হয়েছেন বাবা ও ছেলে। এমন ঘটনায় পুরো গ্রাম শোকাহত।
আহত আফজালের অবস্থা সংকটাপন্ন
দুর্ঘটনায় আহত নুর আলমের ভাগনে আফজাল হোসেন মিঠু (৩১) চট্টগ্রামের সিআরবি হাসপাতালে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন। তিনি মাথা, পা, কোমরে গুরুতর আঘাত পেয়েছেন। অবস্থার অবনতি হওয়ায় আজ বিকেলে তাকে আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্সে করে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা ট্রমা হাসপাতালে স্থানান্তর করা হবে। আফজালের মা জাহানারা বেগম বলেন, ‘আমার বড় ছেলে আফজাল ইউরোপে থাকে। ছয়–সাত বছর ধরে সে ওই দেশে শ্রমিকের কাজ করে। প্রতিবছর ২০-২৫ দিনের ছুটিতে দেশে আসে। এবার ২২ দিনের ছুটিতে ৬ মে সে দেশে এসেছিল। এসে মামা ও মামাতো ভাইকে বাড়িতে নিতে যাচ্ছিল আফজাল। যাওয়ার পথে এমন দুর্ঘটনা ঘটে।’
পুলিশের বক্তব্য
ফেনী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গাজী মুহাম্মদ ফৌজুল আজীম বলেন, নিহত নুর আলমের স্ত্রী বাদী হয়ে সড়ক দুর্ঘটনা আইনে মামলা করেছেন। পুলিশ পরবর্তী আইনগত কার্যক্রম চালাচ্ছে।



