২৭ বছর বয়সে এসে প্রথমবার বাবাকে ‘বাবা’ বলে ডাকলাম। তাঁকে জড়িয়ে ধরলাম, বাবাও আমাকে বুকে টেনে নিলেন। সেই মুহূর্তে নিজেকে মনে হয়েছিল পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ। লিগ্যাল এইডের চট্টগ্রাম কার্যালয়ে জীবনের স্বপ্নপূরণের এ ঘটনা ঘটেছে ৯ জুন।
শৈশবের অপূর্ণতা
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় আমাদের বাড়ি। আমার জন্মের আগেই মা-বাবার সম্পর্কের সুতা ছিঁড়ে যায়। পরে তাঁদের বিচ্ছেদ হয়ে যায়। প্রবাসী বাবা আবার বিদেশে চলে যান। জন্মের পর থেকে আমি মামার বাড়িতেই বড় হয়েছি। মায়ের কাছ থেকেই জেনেছি, কে আমার বাবা। আমাদের বাড়ির কাছাকাছি তাঁর বাড়ি; কিন্তু তত দিনে নতুন সংসার শুরু করেছেন বাবা। বিদেশ থেকে দেশে এলে খুব ইচ্ছা করত তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়াই; কিন্তু শুনতাম, তিনি আমাকে সন্তান হিসেবে মেনে নিতে চান না। বিষয়টি আমাকে নিদারুণ কষ্ট দিত।
একবার শুধু ‘বাবা’ বলে ডাকব—এই আকাঙ্ক্ষা বুকের ভেতর দীর্ঘদিন ধরে জমে ছিল। বন্ধুদের দেখেছি বাবার স্নেহে বড় হতে। সমবয়সী আত্মীয়দের দেখেছি বাবার হাত ধরে হাঁটতে। তখন নিজেকে খুব অসহায় মনে হতো। সবচেয়ে বেশি শূন্যতা অনুভব করেছি ১০–১২ বছর বয়সে।
স্বীকৃতির লড়াই
এভাবেই কেটে গেছে অনেক বছর। আমি পড়াশোনা করেছি, ঢাকায় চাকরি পেয়েছি, নিজের সংসারও হয়েছে; কিন্তু মনের ভেতরের অস্থিরতা কখনো কাটেনি। ‘বাবা’ বলে ডাকার আকুতি সব সময়ই রয়ে গেছে। যাঁকে বাবা বলে জানি, তিনি সত্যিই আমার বাবা—এই স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য ২০২৪ সালের জুন মাসে লিগ্যাল এইড চট্টগ্রামে আবেদন করি। আদালতের নির্দেশে মা, বাবা ও আমার ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়।
এরই মধ্যে আমি নিজেও বাবা হয়েছি। আমার ছেলের বয়স এখন ৯ মাস। তাকে না দেখে আমি থাকতে পারি না। তার হাসি, তার ছোট ছোট ইশারা বারবার আমাকে নিজের শৈশবের অপূর্ণতার কথা মনে করিয়ে দেয়।
পুনর্মিলনের মুহূর্ত
অবশেষে আদালতে ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন আসে। প্রমাণিত হয়, আমি ভুল ছিলাম না। এরপর আমাদের সবাইকে ডাকেন আদালত। সেই দিন—৯ জুন, বাবা আমাকে তাঁর সন্তান হিসেবে স্বীকৃতি দেন। শুধু স্বীকৃতিই নয়, সম্পত্তিতে আমার অধিকার নিশ্চিত করা, ঘর করার জন্য দুই লাখ টাকা এবং আত্মীয়স্বজনের সামনে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার লিখিত অঙ্গীকারও করেন তিনি।
সত্যি বলতে, সম্পত্তির চেয়ে আমার কাছে বাবার স্বীকৃতিই বড়। আমি পেয়েছি তাঁর বুকে মাথা রাখার একটি জায়গা। জীবনে প্রথমবারের মতো পেয়েছি বাবার শরীরের গন্ধ। এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
নতুন সম্পর্কের সূচনা
সেদিনের পর ঢাকায় ফিরে আসি। পরদিন বাবার ফোন। কেন না বলে চলে এলাম, শরীর কেমন আছে, কী খেয়েছি, চাকরি কেমন চলছে—এসব জানতে চাইলেন। জীবনে প্রথমবার বাবা আমার খোঁজ নিচ্ছেন! এখন আমিও বাবাকে ফোন করি। নিয়মিত কথা হয়; অথচ ২৭ বছরে একবারও আমি তাঁকে ‘বাবা’ বলে ডাকতে পারিনি।
এই পুনর্মিলনের জন্য লিগ্যাল এইড চট্টগ্রাম কার্যালয়ের কর্মকর্তা, বিচারক ও সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আমি গভীর কৃতজ্ঞ।



