সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটা এলাকার বাসিন্দা মো. রইছ। বাড়ির ভেতরে মুঠোফোনে কথা বলতে গেলে প্রায়ই তাঁর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। নেটওয়ার্ক পেতে যেতে হয় উঠানে বা রাস্তায়। একই সমস্যায় ভোগেন রাঙামাটির বাঘাইছড়ি এলাকার শিক্ষক মোহাম্মদ আবু তাহের। সম্প্রতি মুঠোফোনে নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে হাজিরা খাতার ছবি পাঠাতে তাঁর গাছে ওঠার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচিত হয়েছে।
শুধু গ্রামীণ এলাকা নয়, শহরেও সমস্যা
শুধু সাতক্ষীরা বা রাঙামাটি নয়, দেশের বহু গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকায় ভবনের ভেতরে দুর্বল মোবাইল নেটওয়ার্ক এখনো একটি বাস্তবতা। সমস্যা রয়েছে শহরেও। এই সমস্যার সমাধানে এবার কম কম্পাঙ্কের তরঙ্গ (লোয়ার-ব্যান্ড স্পেকট্রাম) নিলামের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। দুই বেসরকারি অপারেটরের আবেদনে বিটিআরসির সর্বশেষ কমিশন সভায় এমন সিদ্ধান্ত হয়েছে।
মুঠোফোনের সংকেত বা সিগন্যাল চলাচল করে বেতার তরঙ্গের মাধ্যমে। একে অনেকটা টর্চলাইটের আলোর সঙ্গে তুলনা করা যায়। কিছু টর্চের আলো যেমন দূরে যায়, কিছু টর্চের আলো আবার কাছেই ছড়িয়ে পড়ে। মোবাইল নেটওয়ার্কের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। বর্তমানে অপারেটররা যেসব তরঙ্গ ব্যবহার করে, তা দ্রুতগতির ইন্টারনেট দিতে সক্ষম হলেও দেয়াল, ছাদ বা অন্যান্য বাধা সহজে ভেদ করতে পারে না। ফলে টাওয়ার কাছাকাছি থাকলেও ঘরের ভেতরে সিগন্যাল দুর্বল হয়ে যায়।
লোয়ার-ব্যান্ড স্পেকট্রামের সুবিধা
টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘লোয়ার-ব্যান্ড’ তরঙ্গের সুবিধা হলো, এটি তুলনামূলক বেশি দূর পর্যন্ত যেতে পারে এবং ভবনের ভেতরেও ভালোভাবে প্রবেশ করতে পারে। এ কারণেই বিশ্বের অনেক দেশে গ্রামীণ কভারেজ উন্নত করতে এই ধরনের তরঙ্গকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বিটিআরসির সর্বশেষ কমিশন সভায় মোবাইল অপারেটরদের অতিরিক্ত লোয়ার-ব্যান্ড তরঙ্গ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ৮৮০ থেকে ৮৮৮ দশমিক ৪ মেগাহার্টজ এবং ৯২৫ থেকে ৯৩৩ দশমিক ৪ মেগাহার্টজ রেঞ্জের ‘এক্সটেন্ডেড জিএসএম’ বা ইজিএসএম ব্যান্ডকে বেছে নেওয়া হয়েছে।
কমিশনের কারিগরি কমিটির এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইজিএসএম ব্যান্ডের সংকেত দূরে যায় এবং দেয়াল ভেদ করার ক্ষমতা বেশি। ফলে ঘনবসতিপূর্ণ শহরে ভবনের ভেতরে এবং দূরের প্রত্যন্ত এলাকায়—উভয় জায়গায় নেটওয়ার্ক উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই ব্যান্ডের আরেকটি বড় সুবিধা হলো, দেশের প্রায় সব মোবাইল হ্যান্ডসেট এটি সমর্থন করে।
নিলাম প্রক্রিয়া ও সময়সীমা
তরঙ্গের দাম নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছে কমিশন। সিদ্ধান্ত পেলেই এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে নিলাম হতে পারে বলে জানিয়েছেন বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘তরঙ্গের দাম নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছে কমিশন। সিদ্ধান্ত পেলেই এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে নিলাম হতে পারে।’
নিলামে একাধিক অপারেটর একই স্পেকট্রাম ব্লকের জন্য আবেদন করায় সরাসরি বরাদ্দের বদলে প্রতিযোগিতামূলক নিলামের মাধ্যমে তা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন বিটিআরসির কর্মকর্তারা। নতুন এই বরাদ্দের মেয়াদ থাকবে ২০৩০ সাল পর্যন্ত, অর্থাৎ চার বছর।
নিলামের আগে মোট ৮.৪ মেগাহার্টজ তরঙ্গকে দুই ভাগে ভাগ করে কারিগরি যাচাই করেছে বিটিআরসি। ৫ মেগাহার্টজের ব্লক-এ এবং ৩.৪ মেগাহার্টজের ব্লক-বি। এই যাচাইয়ে দেখা গেছে, সীমান্তের ওপারে ভারতীয় অপারেটরদের একই ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহারের কারণে সীমান্ত-সংলগ্ন এলাকায় তরঙ্গে ‘ইন্টারফেরেন্স’ বা সংকেত-বিকৃতি ঘটছে। ফলে ব্লক-এ ব্যবহার করা যাবে না দেশের প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ এলাকায়। মূলত রংপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম সীমান্তে। ব্লক-বি-তে সমস্যা তুলনামূলক কম, প্রভাবিত এলাকা মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ।
রবি আজিয়াটা ও বাংলালিংক ৩.৪ মেগাহার্টজ ব্লকের জন্য আবেদন করেছে। ব্লক-বি-র ভিত্তিমূল্য ১৫ বছর মেয়াদের পুরোনো বেঞ্চমার্ক অনুযায়ী প্রতি মেগাহার্টজ ২৩৭ কোটি টাকা ধরা হলেও নতুন বরাদ্দ মাত্র চার বছরের হওয়ায় এখানেও ১০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়ের কথা বিবেচনা করছে কমিশন।
সুফল মিলবে কবে?
বিটিআরসির হিসাবে বর্তমানে দেশে মুঠোফোন গ্রাহকের সংখ্যা ১৮ কোটির বেশি। রাষ্ট্রীয় মোবাইল অপারেটর টেলিটকসহ মোট চারটি অপারেটর মুঠোফোন সেবা দেয়। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গ্রাহক গ্রামীণফোনের। দুর্গম এলাকায় সেবার মান বাড়াতে সম্প্রতি ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের তরঙ্গ চালু করেছে অপারেটরটি। ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের তরঙ্গ বরাদ্দ পেয়েছে টেলিটকও। অন্যদিকে রবি ও বাংলালিংক ইজিএসএম ব্যান্ডের তরঙ্গ চেয়েছে।
তবে তরঙ্গ বরাদ্দ পেলেই নেটওয়ার্ক উন্নত হয় না। অপারেটরদের নতুন বেজস্টেশন স্থাপন করতে হয়, বিনিয়োগ করতে হয়। এই প্রক্রিয়া কিছুটা সময়সাপেক্ষ। এ ক্ষেত্রে অবশ্য অপারেটরগুলোর আগে থেকেই ইজিএসএম নেটওয়ার্ক রয়েছে। তাই নিলাম প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন হলে তরঙ্গ চালু করতে খুব বেশি সময় লাগবে না বলে জানিয়েছে মোবাইল অপারেটরগুলো।
জানতে চাইলে বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার তাইমুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘চলতি বছরেই এই তরঙ্গের কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব।’



