মাইক্রোসফটের যাত্রা: গ্যারেজ থেকে বিশ্বজয়, ৫১ বছরের সাফল্যের গল্প
মাইক্রোসফটের ৫১ বছর: গ্যারেজ থেকে বিশ্বজয়

মাইক্রোসফট: একটি বিপ্লবের নাম

আধুনিক প্রযুক্তির ইতিহাসে মাইক্রোসফট কেবল একটি কোম্পানির নাম নয়, এটি একটি যুগান্তকারী বিপ্লবের প্রতীক। ১৯৭৫ সালের ৪ এপ্রিল হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে আসা বিল গেটস ও তাঁর বন্ধু পল অ্যালেনের হাত ধরে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান ও প্রভাবশালী সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ২০২৬ সালে এই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান তাদের প্রতিষ্ঠার ৫১ বছর পূর্ণ করেছে। একটি ছোট গ্যারেজ থেকে শুরু করে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের ডেস্কটপে জায়গা করে নেওয়ার গল্পটি যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনি অনুপ্রেরণাদায়ক।

শুরুর দিনগুলি: একটি ঐতিহাসিক চুক্তি

বিল গেটস ও পল অ্যালেনের পরিচয় হয়েছিল স্কুলে। সেই সময় দুজনেরই স্বপ্ন ছিল একদিন একটি কম্পিউটারের মালিক হওয়ার। তখন কম্পিউটার ছিল বিশাল ও ব্যয়বহুল যন্ত্র, যা কেবল বিজ্ঞানীরা এবং সামরিক বাহিনী ব্যবহার করত। হাইস্কুল শেষ করার পর গেটস হার্ভার্ডে ভর্তি হন এবং অ্যালেনের সঙ্গে মিলে ট্র্যাফ-ও-ডেটা নামের একটি ছোট ব্যবসা শুরু করেন। এই জুটি রিয়েল-টাইমে ট্র্যাফিক প্রবাহ বিশ্লেষণ করার জন্য একটি সিস্টেম তৈরি করে, যা স্প্রেডশিট আকারে ফলাফল উপস্থাপন করত।

১৯৭০-এর দশকের শুরুতে তাঁরা প্রথম সাশ্রয়ী ও বহনযোগ্য কম্পিউটার অ্যালটেয়ার ৮৮০০ সম্পর্কে একটি ম্যাগাজিনের নিবন্ধ পড়েন। সেই নিবন্ধ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে গেটস ও অ্যালেন কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁরা অ্যালটেয়ার ৮৮০০ নির্মাতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং তাঁদের কার্যকর সফটওয়্যার ব্যবহারের প্রস্তাব দেন। বাস্তবে তাঁরা তখনো কোডটি লেখেননি, শুধু ধারণাটির খসড়া তৈরি করেছিলেন। এরপর গেটস হার্ভার্ড থেকে পড়াশোনা ছেড়ে দেন এবং দুজনে একটি গ্যারেজে বসে দিনরাত কোডিং শুরু করেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে অ্যালটেয়ার কম্পিউটারের জন্য একটি প্রোগ্রাম তৈরির সফল চুক্তি বিল গেটস ও পল অ্যালেনকে মাইক্রোসফট গঠনের অনুপ্রেরণা দেয়। তখন নিউ মেক্সিকোর এক গ্যারেজে কাজ করতেন তাঁরা। মাইক্রোপ্রসেসর ও সফটওয়্যারের সংক্ষিপ্ত রূপ থেকে ‘মাইক্রো-সফট’ নামকরণ করা হয়। প্রথম বছরে তাদের আয় ছিল মাত্র ১৬ হাজার ডলার। তবে মাইক্রোসফটের ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায় ১৯৮০ সালে আইবিএমের সঙ্গে একটি অংশীদারত্বের মাধ্যমে। মাইক্রোসফট আইবিএম পিসির জন্য ডস অপারেটিং সিস্টেম সরবরাহ করার চুক্তি করে, যেখানে সব আইবিএম কম্পিউটার বিক্রির জন্য মাইক্রোসফট একটি রয়্যালটি পেত। এই একটি সিদ্ধান্তই মাইক্রোসফটকে পিসি সফটওয়্যারের একক মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

উইন্ডোজের উত্থান: বিশ্বজুড়ে আধিপত্য

১৯৯০ সালে উইন্ডোজ ৩.০ বাজারে আসার মাধ্যমে মাইক্রোসফট হার্ডওয়্যার নির্মাতাদের থেকে সরাসরি সাধারণ ভোক্তাদের পছন্দের ব্র্যান্ড হয়ে ওঠে। এটি ছিল বিশ্বের প্রথম সফটওয়্যার কোম্পানি, যা ১০০ কোটি ডলার আয়ের মাইলফলক স্পর্শ করে। পরবর্তী বছরগুলোতে উইন্ডোজের বিভিন্ন সংস্করণ (উইন্ডোজ ৯৫, ৯৮, এক্সপি) আসার কারণে বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ পিসি মাইক্রোসফটের দখলে চলে আসে। ২০০১ সালে আসা উইন্ডোজ এক্সপি এর স্থায়িত্ব ও গতির কারণে আজও করপোরেট গ্রাহকদের কাছে একটি স্মরণীয় নাম। এরপর উইন্ডোজ ৭, ৮ এবং হালনাগাদ উইন্ডোজ ১১ সংস্করণের মাধ্যমে মাইক্রোসফট তাদের শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে।

সাফল্যের নেপথ্যে: সময়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া

মাইক্রোসফটের সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে সময়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা এবং বৈচিত্র্যময় পণ্যসম্ভার। কোম্পানিটি কেবল উইন্ডোজেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। শুরু থেকেই মাইক্রোসফট ব্যক্তিগত কম্পিউটারের পাশাপাশি ব্যবসায়িক বা এন্টারপ্রাইজ বাজারকে লক্ষ্য করে সফটওয়্যার তৈরি করেছে, যা তাদের আয়ের প্রধান উৎস। মাইক্রোসফটের ওয়ার্ড, এক্সেল ও পাওয়ারপয়েন্টের মতো সফটওয়্যারগুলো বিশ্বজুড়ে দাপ্তরিক কাজের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। বিল গেটসের পর স্টিভ বালমার এবং বর্তমানে সত্য নাদেলার দূরদর্শী নেতৃত্ব কোম্পানিটিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। নাদেলার অধীন মাইক্রোসফট ক্লাউড ফার্স্ট, মোবাইল ফার্স্ট নীতি গ্রহণ করে সফল হয়েছে।

যুগান্তকারী উদ্ভাবন: বিশ্বকে বদলে দেওয়া পণ্য

মাইক্রোসফটের ইতিহাসে কিছু পণ্য ও প্রযুক্তি পুরো বিশ্বকে বদলে দিয়েছে। ২০০১ সালে গেমিং জগতে প্রবেশ করে মাইক্রোসফট। এক্সবক্স ও এক্সবক্স লাইভ সার্ভিসটি তাদের ভিডিও গেমিং মার্কেটে দ্বিতীয় শীর্ষস্থানে নিয়ে আসে। ২০১১ সালে ৮৫০ কোটি ডলারে স্কাইপ কিনে নেয় মাইক্রোসফট, যা ছিল তাদের তৎকালীন ইতিহাসের বৃহত্তম অধিগ্রহণ। এর মাধ্যমে অ্যাপল ও গুগলের ভিডিও কলিং পরিষেবার সঙ্গে পাল্লা দেয় তারা। ২০০৮ সালে অ্যাজুর প্ল্যাটফর্ম মাইক্রোসফটকে ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের শীর্ষে নিয়ে যায়। আজ বিশ্বের বড় বড় প্রতিষ্ঠান তাদের তথ্য সংরক্ষণে অ্যাজুর ব্যবহার করছে। হার্ডওয়্যার জগতেও মাইক্রোসফট তাদের সারফেস সিরিজের ট্যাবলেট ও ল্যাপটপের মাধ্যমে চমৎকার উদ্ভাবন দেখিয়েছে। ২০২৩ সাল থেকে ওপেনএআইয়ের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে মাইক্রোসফট কোপাইলট নামের এআই সঙ্গী চালু করেছে, যা বিং সার্চ ও উইন্ডোজকে আরও বুদ্ধিমান করে তুলেছে।

ভবিষ্যৎ লক্ষ্য: পরিবেশ ও কোয়ান্টাম কম্পিউটিং

মাইক্রোসফট কেবল ব্যবসাই করছে না, বরং ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নেগেটিভ হওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। তারা যতটুকু কার্বন নিঃসরণ করবে, তার চেয়ে বেশি পরিবেশ থেকে অপসারণ করবে। ২০২৫ সালে কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের জন্য মেজরানা ১ চিপ উন্মোচন করে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হয়।