স্টার্টআপ সংকট: চালডাল ও সেবা প্ল্যাটফর্মে কর্মীদের বকেয়া বেতনে অস্থিরতা
চালডাল ও সেবা প্ল্যাটফর্মে বকেয়া বেতনে অস্থিরতা

স্টার্টআপ সংকট: চালডাল ও সেবা প্ল্যাটফর্মে কর্মীদের বকেয়া বেতনে অস্থিরতা

দেশের শীর্ষস্থানীয় দুই স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান চালডাল ডটকম ও সেবা প্ল্যাটফর্মে কর্মীদের বকেয়া বেতন নিয়ে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। দুই কোম্পানিতে মোট আড়াই হাজারের বেশি কর্মী কাজ করেন, যাদের অনেকে মাসের পর মাস বেতন না পাওয়ায় অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।

যশোরে চালডাল কর্মীদের বিক্ষোভ

যশোর সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কে চালডালের প্রায় ৬০০ কর্মী গত সোমবার বকেয়া বেতনের দাবিতে বিক্ষোভ করেন। কর্মীরা জানুয়ারি মাসের বেতন পাননি বলে জানা গেছে। তবে ডিসেম্বর মাসের বেতন পরিশোধের পর বৃহস্পতিবার থেকে কর্মীরা আবার অফিসে কাজ শুরু করেছেন।

সেবা প্ল্যাটফর্মে তিন-চার মাসের বকেয়া বেতন

সেবা প্ল্যাটফর্মের প্রায় ৪৫০ জন কর্মীর মধ্যে প্রায় ৩০০ জনের তিন থেকে চার মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তাঁর অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বর—এই তিন মাসের বেতন দেওয়া হয়নি। বকেয়া বেতনের পরিমাণ প্রায় ৭ লাখ ৭০ হাজার টাকা।

সিইও আদনান ইমতিয়াজের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

সেবা গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আদনান ইমতিয়াজের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির বিষয়টি সামনে এসেছে। সেবা এক্সওয়াইজেডের চেয়ারম্যান আদনান ইমতিয়াজের বিরুদ্ধে বেতনের বিপরীতে কর বাবদ প্রায় ১৮ লাখ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা না দেওয়ার অভিযোগে একটি ফৌজদারি মামলা করেছেন প্রতিষ্ঠানটির সাবেক প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা রোনাল্ড মিকি গোমেজ।

বিনিয়োগ সংকটের কারণ

দুই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সময়মতো বিনিয়োগ না পাওয়াই এ সংকটের বড় কারণ। সেবা প্ল্যাটফর্মের সিইও আদনান ইমতিয়াজ বলেন, প্রতিষ্ঠানটি শুরু থেকেই পুরোপুরি দেশীয় বিনিয়োগে গড়ে ওঠা একটি স্টার্টআপ। তবে গত নভেম্বর মাসে বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে যায় এবং রাজস্ব প্রায় শূন্যে নেমে আসায় সংকট তৈরি হয়েছে।

চালডালের আর্থিক অবস্থা

চালডাল ডটকমের সিইও ওয়াসিম আলিম জানান, প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরুর পর ২০২৪ সাল পর্যন্ত কখনো বেতন দিতে সমস্যা হয়নি। কিন্তু ২০২৪ সালের পর বিদেশি বিনিয়োগ কমে যায়। ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা ছিল প্রায় ৮০ থেকে ১০০ কোটি টাকার তহবিল সংগ্রহ করা, কিন্তু সে বছরে ৫০ কোটি টাকার কম তহবিল পাওয়া যায়।

দেশীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান লাইটক্যাসল পার্টনার্সের তথ্যমতে, চালডাল ডটকম ২০১৫ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মোট ৩ কোটি ৪৪ লাখ ডলার বিনিয়োগ পেয়েছে। এর মধ্যে দেশীয় বিনিয়োগ ছিল ৫৩ লাখ ডলারের বেশি, আর বিদেশি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল থেকে এসেছে ২ কোটি ৯১ লাখ ডলার।

রাজস্ব ও মুনাফার হ্রাস

চালডালের বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির মোট রাজস্ব আয় ছিল প্রায় ৩৯৭ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৪৯৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে রাজস্ব কমেছে প্রায় ৯৬ কোটি টাকা। রাজস্ব কমে যাওয়ায় কর–পূর্ব মুনাফা কমেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৬৫ কোটি টাকার কর–পূর্ব মুনাফা করলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে হয় ১৯ কোটি টাকা।

২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির কর–পরবর্তী লোকসান হয় ৫৬ কোটি টাকা, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ৪৯ কোটি টাকা। বর্তমানে চালডাল ডটকমের সব কর্মীর মাসিক বেতনের পরিমাণ ১২ কোটি টাকার বেশি।

স্টার্টআপ খাতের চ্যালেঞ্জ

ওয়াসিম আলিম আরও বলেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো লোকসান করলে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ পাওয়া যায়। কিন্তু স্টার্টআপের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ সীমিত। গত এক থেকে দেড় বছরে পর্যাপ্ত বিদেশি বিনিয়োগ না পাওয়ায় এই সংকট তৈরি হয়েছে।

এদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চাকরিচ্যুত কর্মীদের নানা পোস্ট দেখা যাচ্ছে, যা সংকটের গভীরতা তুলে ধরছে। দুই প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা এখন অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে সময় পার করছেন, আর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।