রিলসের ফাঁদে সময় হারানোর বিজ্ঞান ও ব্যবসা
রিলসের ফাঁদে সময় হারানোর বিজ্ঞান ও ব্যবসা

মনে হলো ফোনটা একটু চেক করি। এরপর রিলস দেখতে বসে গেলেন। অতঃপর জীবন থেকে হারিয়ে গেল এক ঘণ্টা। ভিডিও দেখতে দেখতে একটা ব্যাপার আপনি নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন। একটা ফানি ক্লিপ দেখলে পরের চারটাও একই রকম ফানি। কালকে একটা গেমিং ভিডিওতে আটকে গিয়েছিলেন, আজ সকাল থেকে ফিডে শুধু গেমিং আর গেমিং ভিডিও। এটা কাকতালীয় কিছু নয়; বরং একটা পুরো সিস্টেম প্রতিবার স্ক্রল করার সময় আপনার হিসাব করছে।

ব্যাপারটা শুরু হয় খুব সাধারণ কিছু থেকে। আপনি একটা ভিডিওতে তিন থেকে চার সেকেন্ড থেমে গেলেন, অ্যাপ এটাকে একটা সিগন্যাল ধরে নেয়। লাইক দিলে সিগন্যালটা আরও জোরালো হয়। কমেন্টে গিয়ে কিছু লিখলে আরও বেশি। আর এক সেকেন্ডে স্কিপ করলে অ্যাপ বুঝে নেয়, এটা পছন্দ হয়নি। আপনি এসব করার সময় আপনার মাথায় বিশেষ কিছু চলে না, কিন্তু ফোনের ভেতরে একটা হিসাব–নিকাশ ঠিকই চলতে থাকে।

অ্যাপ আপনার নাম জানে না, স্কুলের নাম জানে না। কিন্তু আপনার আঙুলের অভ্যাস দিয়ে সে আপনার রুচি কেমন, সেটা বুঝে নেয়। একদিন রাতে বোরড হয়ে একটা মোটিভেশনাল ভিডিও দেখে ফেলেছেন, ব্যস। পরদিন সকাল থেকে কোটেশন কার্ড, সাকসেস স্টোরি, কেউ একজন কীভাবে জিরো থেকে হিরো হলো এসব ভিডিও। এক সপ্তাহ পর আপনি নিজেই ভাবছেন, আমি তো এতে এত ইন্টারেস্টেড ছিলাম না। কিন্তু অ্যাপের কাছে এটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। আপনি একবার থেমেছিলেন। ওটাই যথেষ্ট প্রমাণ।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রিলসের মনোযোগ চক্র

এরপরের অংশটা একটা চক্রের মতো। যেটা একবার কাজ করেছে, অ্যাপ সেটাই আবার দেয়। আপনি আবার থামেন। অ্যাপ আরেকটু নিশ্চিত হয়। কয়েক রাউন্ড গেলে আপনার ফিড সরু হতে শুরু করে। নতুন কিছু দেখানোর রিস্ক অ্যাপ নিতে চায় না। কারণ, নতুন জিনিস দেখালে আপনি স্ক্রল করে চলে যেতে পারেন। পরিচিত জিনিসে থামবেন, এটা অ্যাপ আগে থেকেই জানে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ফিল্টার বাবল ও বিজ্ঞাপনের ব্যবসা

গবেষকেরা এটাকে ফিল্টার বাবল বলেন। আপনি একটা ছোট জায়গার ভেতরে আছেন, যেখান থেকে বাইরেটা দেখা যায়, কিন্তু পুরোটা নয়। আপনার মনে হতে থাকে ইন্টারনেটজুড়ে যেন সবাই এই একই বিষয়ে কথা বলছে। আসলে তা নয়। ইন্টারনেট অনেক বড়, কিন্তু আপনাকে যে অংশটা দেখানো হচ্ছে, সেটা ছোট, আর সেটা দিন দিন আরও ছোট হতে থাকে।

কোম্পানিগুলো কেন এমন একটা সিস্টেম বানিয়েছে, এই প্রশ্নও দরকারি। উত্তর সহজ, টাকা। আপনি যত বেশি সময় কাটাবেন, বিজ্ঞাপন তত বেশি দেখবেন, কোম্পানি তত বেশি আয় করবে। আপনার সময়টাই আসলে তাদের পণ্য। ভিডিও নয়, আপনি নন, আপনার মনোযোগ। তাই এমন একটা মেশিন বানানো হয়েছে, যেটা আপনার মনের সবচেয়ে দুর্বল জায়গাটা চেনে। একটু আরও দেখি, এই ভাব।

ডোপামিন ও মস্তিষ্কের দুর্বলতা

মস্তিষ্কও এখানে কম দায়ী নয়। পছন্দের কিছু দেখলে মাথায় ডোপামিন রাসায়নিক বের হয়, যা ভালো লাগার অনুভূতি দেয়। অ্যাপগুলো এই টাইমিং ভালোই বুঝে ফেলেছে। শিশুকে একবার চকলেট দিলে সে আবার চায়। আপনার মস্তিষ্কও কাছাকাছি, একবার ভালো লাগা পেলে আরও চায়, আর অ্যাপ ঠিক সময়ে আবার সেটাই দিয়ে যায়। কখনো একটু কম দেয়, কখনো একটু বেশি, যেন প্যাটার্নটা চোখে না পড়ে।

আপনার মতো যারা একই ধরনের ভিডিওতে থামে, তাদের সবার ডেটা একসঙ্গে মিলিয়ে অ্যাপ একটা বড় প্যাটার্ন বানায়। মানে আপনি একা নন। লাখ লাখ কিশোর–কিশোরী একই রাতে একই ঘরানার ভিডিও দেখছে। আর অ্যাপ সবার আচরণ মিলিয়ে বুঝে নেয়, এই গ্রুপকে এরপরে কী দেখালে তারা থামবে। আপনি এমন একটা প্যাটার্নে আটকে গেছেন, যেটা আপনি একা তৈরি করেননি। কিন্তু আটকে গেছেন, এটাও সত্যি।

মুক্তির উপায়

এখান থেকে পুরোপুরি বের হওয়া আসলে কঠিন। ইন্টারনেটের বড় একটা অংশ এখন এই নিয়মেই চলে। তবে কিছু ছোট অভ্যাসে কাজ হয়। মাঝেমধ্যে এমন কিছু সার্চ করুন, যা আগে কখনো করেননি। কোনো ভিডিও পছন্দ না হলে শুধু স্কিপ না করে ফিডব্যাক অপশনে গিয়ে জানিয়ে দিন, এটা আর দেখতে চান না। কিছু অ্যাপে ইন্টারেস্ট রিসেট করার অপশন থাকে, মাঝেমধ্যে সেটাও চাপা যায়। আরেকটি কাজ সবচেয়ে বেশি কাজে দেয়, নিজেকে প্রশ্ন করা, আমি কি এটা দেখতে চাইছি, নাকি অ্যাপ আমাকে দেখাতে চাইছে।

একটা জিনিস এখানে বলে রাখা ভালো। এই পুরো সিস্টেম খারাপ মানুষের তৈরি কোনো ষড়যন্ত্র নয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এটা একটা ব্যবসার মডেল, যেটা সময়ের সঙ্গে আরও স্মার্ট হয়ে উঠেছে। সমস্যা হলো, এই মডেল চলে আপনার মনোযোগের ওপর। আপনি যত বেশি সময় দেবেন, সিস্টেম তত বেশি লাভবান হবে। আপনার লাভ হচ্ছে কি না, সেটা আলাদা প্রশ্ন।

এটাও মনে রাখার মতো, সবার ফিড আলাদা। আপনার বন্ধুর ফোনে যা দেখাচ্ছে, আপনার ফোনে তা নয়। তাই কোনো একটা বিষয় নিয়ে যদি আপনার মনে হয় সবাই কথা বলছে, একটু থেমে চেক করুন, এটা কি সত্যিই সবাই বলছে, নাকি আপনার ফিডই আপনাকে এটা বলে যাচ্ছে বারবার। এই পার্থক্য বোঝা শুরু করলে অ্যাপ ব্যবহার করার সময় একটা ভিন্ন রকম সচেতনতা আসে। পুরোপুরি বের হওয়া যাবে না, কিন্তু অন্তত বুঝে ব্যবহার করা যাবে। আর সেটাই আসলে সবচেয়ে বড় পার্থক্য তৈরি করে কোনো কিছু না বুঝে ব্যবহার করা আর বুঝে ব্যবহার করার মধ্যে।

সূত্র: এনবিসি নিউজ