রাজমিস্ত্রির সহকারী থেকে ভাইরাল তারকা: তাইজুল ইসলামের ডিজিটাল স্বপ্নযাত্রা
অভাব-দারিদ্র্যের মাঝে জন্ম নেওয়া রাজমিস্ত্রির হেলপার মো. তাইজুল ইসলামের স্বপ্ন ছিল ফেসবুকের মাধ্যমে ভাগ্য বদলানো। আজ সেই স্বপ্ন পূরণের পথে তিনি এগিয়ে চলেছেন দৃপ্ত পদক্ষেপে। ঢাকার বিভিন্ন নির্মাণস্থলের কর্মব্যস্ততার ফাঁকে শখের বশে তৈরি করা ভিডিওগুলো এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও সমর্থনের জন্ম দিয়েছে।
প্রত্যন্ত চর থেকে রাজধানীর পথ
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার প্রত্যন্ত চর নারায়নপুরের বাসিন্দা তাইজুল ইসলাম এখন তার এলাকার অবহেলিত মানুষের দুর্ভোগ ও সংগ্রামের কথা তুলে ধরার মাধ্যমে সবার নজরে আসছেন। পেশায় একজন রাজমিস্ত্রির সহকারী এই তরুণ ছয় ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় হওয়ার সুবাদে সংসারের অভাব দূর করতে পাড়ি জমিয়েছেন রাজধানী ঢাকায়।
তার পরিবারের পটভূমি অত্যন্ত করুণ: বাবা-মা উভয়েই শ্রবণ প্রতিবন্ধী, নিজেদের কোনো জমিজমা নেই—এমন এক চরম প্রতিকূল পরিবেশ থেকে উঠে এসে তিনি হাতে তুলে নিয়েছেন মোবাইল ফোন। সংসারের দুঃখ-কষ্ট ভুলতে গিয়েই শুরু করেন ভিডিও তৈরির কাজ, যা মাত্র এক মাসের ব্যবধানে জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে।
ভাইরাল ভিডিও: জিলাপির দাম নিয়ে সরব হওয়া
সবশেষ, ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে তৈরি করা একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, স্থানীয় একটি দোকানে জিলাপি বিক্রির দাম ও মান নিয়ে তাইজুল দোকানির সঙ্গে সরাসরি কথা বলছেন। ভিডিওতে তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে? যদি জনগণকে বলতেন তাহলে অনেক খুশি হইতাম।’
মুহূর্তেই ভিডিওটি ইন্টারনেট দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রায় ৫০ লাখ মানুষ এটি দেখেছেন। ভিডিওটির নিচে নেটিজেনদের মধ্যে চলছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া; কেউ কেউ তাইজুলের সাহস ও স্পষ্টভাষিতার প্রশংসা করছেন, আবার কেউবা তাকে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছেন বিভিন্ন মন্তব্যের মাধ্যমে।
তাইজুলের অভিপ্রায়: এলাকার মানুষের কষ্টের কথা বলা
নিজের এই ভিডিও তৈরির উদ্দেশ্য সম্পর্কে তাইজুল ইসলাম স্পষ্ট করে বলেন, ‘আমি সাংবাদিক নই। আমি মূলত মনের কষ্ট ভুলতে এবং আমাদের এলাকার অবহেলিত মানুষের কথা প্রশাসনের কাছে পৌঁছাতে ভিডিও করি। আমাদের নারায়নপুর চরে আসতে চারটি নৌঘাট পাড়ি দিতে হয়। এখানকার দুর্গমতার কারণে সাংবাদিকরা আসতে চান না, আমাদের এলাকার খবর প্রচার হয় না। আমাকে ট্রল করা হলেও কষ্ট নেই, আমি চাই আমার এলাকার মানুষের উন্নয়ন হোক।’
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, তাইজুলের মা রাস্তায় মাটির কাজ করেন এবং বাবা শ্রবণ প্রতিবন্ধী। নিজে নির্মাণশ্রমিক হিসেবে ঢাকায় কাজ করার পাশাপাশি তিন-চার মাস পরপর বাড়িতে এসে তিনি ভিডিওর কাজ চালিয়ে যান। বিনোদনপ্রেমী তাইজুল গান-বাজনার দলের সঙ্গে থাকতে পছন্দ করেন এবং এই কাজের মাধ্যমেই চরের মানুষের কষ্টের কথা সরাসরি সরকারের দৃষ্টিতে আনতে চান।
সমালোচনা ও ভবিষ্যৎ স্বপ্ন
মানুষের সমালোচনা প্রসঙ্গে তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমি বোকাসোকা মানুষ, আমার ভুল হতেই পারে। আপনারা আমাকে ট্রল করেন, এতে আমার কোনো আক্ষেপ নেই। আমার একটাই চাওয়া, চরের সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ যেন প্রশাসনের নজরে আসে।’
তাইজুল ইসলামের এই যাত্রা শুধু একটি ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়, বরং এটি প্রমাণ করে কীভাবে ডিজিটাল মাধ্যম সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বরকে শক্তিশালী করতে পারে। তার ভিডিওগুলো এখন কুড়িগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছে এবং সামাজিক পরিবর্তনের একটি হাতিয়ার হয়ে উঠছে।



