প্রথম আলোর অগ্নিদগ্ধ ভবনের ধ্বংসাবশেষে 'আলো' প্রদর্শনী: দর্শনার্থীদের হতাশা ও প্রতিবাদের প্রতিধ্বনি
প্রথম আলোর অগ্নিদগ্ধ ভবনের ধ্বংসাবশেষ থেকে তৈরি শিল্পকর্ম নিয়ে আয়োজিত 'আলো' প্রদর্শনী দেখে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরীসহ শতাধিক দর্শনার্থী গভীর হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। আজ বুধবার বেলা ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত এই প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন তাঁরা, যেখানে গণমাধ্যমের ওপর হামলার ভয়াবহতা নতুন করে অনুভূত হয়েছে।
রাশেদা কে চৌধূরীর মর্মস্পর্শী প্রতিক্রিয়া
রাশেদা কে চৌধূরী প্রদর্শনী দেখে বলেন, 'সেদিন অনেক রাত পর্যন্ত জেগে লাইভে দেখেছি। হতভম্ব হয়েছি, ক্ষুব্ধ হয়েছি, হতাশ হয়েছি। সে রাতের ঘটনা কত ভয়াবহ ছিল, আজ না দেখলে বুঝতাম না। গণমাধ্যমের ওপরে আক্রমণ তো আমাদের জাতির বিবেকের ওপরেই আক্রমণ।' তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময়কার তরুণ প্রজন্ম ও জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের কথা উল্লেখ করে যোগ করেন, 'আজকে এই প্রদর্শনীতে যা দেখলাম, সেটি দেখে মনে হলো সম্ভবত আমাদের এই প্রবীণ প্রজন্মই আমাদের সন্তানদের মানবিক মূল্যবোধে শিক্ষিত করতে পারিনি। তারা লেখাপড়া শিখেছে, বড় হয়েছে, কিন্তু মানবিকতা বোধটা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।'
অঞ্জন চৌধুরীর জাতীয় লজ্জার কথা
স্কয়ার এয়ার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অঞ্জন চৌধুরী প্রদর্শনী দেখে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বললেন, 'এটা আসলে আমাদের জাতির লজ্জা যে একটা গণমাধ্যমের ওপর আমাদের নিজের দেশের মানুষ এমন হামলা করেছে। এটা মেনে নেওয়া যায় না। একটা দেশ কষ্ট করে স্বাধীন করেছি আমরা, সে স্বাধীন দেশে গণমাধ্যমের ওপর এ রকম হামলা, এটা মেনে নেওয়া যায় না।' তিনি আরও উল্লেখ করেন যে সমালোচনা ভাষার মধ্য দিয়েই করা উচিত, ধ্বংসাত্মক পথে নয়।
বিভিন্ন শ্রেণির দর্শনার্থীদের আবেগঘন অভিজ্ঞতা
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য দীপায়ন খীসা বলেন, 'দুঃসহ স্মৃতির যে রাত, সে রাতটিকে আরেকবার দেখলাম। প্রথম আলো এটিকে যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছে, ওই রাতের ভয়াবহতা আমাদেরকে আবারও স্মরণ করিয়ে দেয়। যারা এ হামলা করেছে তাদের একটা রাজনৈতিক দর্শন রয়েছে, তারা ধর্মীয় উগ্রবাদ লালন করে।'
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজির (বিইউবিটি) শিক্ষার্থী তাজমিরা ইসলাম তোয়া বলেন, 'পোড়া জিনিসগুলো থেকে কীভাবে কারুকার্য তৈরি করা যায়, সেটি দেখিয়েছে প্রথম আলো। পোড়াগুলো দেখে যদিও খারাপ লেগেছে, তবে একটি দিক দেখে ভালো লেগেছে সেটি হলো, পোড়া জিনিসগুলোকে যে নতুন শিল্পকর্মের রূপ দিয়েছে, সেটা থেকে আমরা অনেক কিছু শিখতে পেরেছি।'
পরিবারসহ দর্শনার্থীদের আশা ও দাবি
লেখক আবুল মনসুর স্ত্রী নাজলী লাইলা মনসুরকে নিয়ে প্রদর্শনী দেখে বলেন, 'শিল্পের শক্তির একটা বহিঃপ্রকাশ এই প্রদর্শনী। ধ্বংসস্তূপ আবর্জনা ফেলে দেওয়ার জিনিস, সেটা যে রূপান্তরিত হয়ে শিল্পে পরিণত হতে পারে, এই উপলব্ধিটা আমরা ভালোভাবে জানলাম।'
রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা রাহিদ হাসান স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে এসে বলেন, 'শিল্প–সাহিত্য–সংস্কৃতির ওপর এ রকম আঘাত মেনে নেওয়া যায় না। যারা এ ধরনের কর্মকাণ্ড করেছে তাদের বিচার হোক, শাস্তি হোক। আমি যেন আমার সন্তানকে দেখাতে পারি যে দেখো, যারা আগুন দিয়েছে তাদের শাস্তি হয়েছে।'
গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে প্রথম আলো ভবনে হামলা ও অগ্নিসংযোগের পর ১৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই প্রদর্শনী দর্শনার্থীদের মধ্যে নতুন করে ভয়াবহতা উপলব্ধি করিয়েছে। অনেকেই গণমাধ্যমের ওপর হামলাকারীদের দ্রুত বিচার ও শান্তি ফিরে আসার দাবি জানিয়েছেন, পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হওয়ার আশা ব্যক্ত করেছেন।
