স্পেনে শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিধিনিষেধ: বিশ্বব্যাপী আলোচনার নতুন মাত্রা
যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স ও ডেনমার্কের পর এবার শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিধিনিষেধের ঘোষণা দিয়েছে স্পেন। ৩ ফেব্রুয়ারি দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড গভর্নমেন্টস সামিটে দেশটির প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেন, 'বর্তমান ডিজিটাল পরিবেশ শিশুদের জন্য নিরাপদ নয়। শিশুরা এমন এক ডিজিটাল পরিসরে প্রবেশ করছে, যেখানে তাদের একা চলার কথা ছিল না। এই পরিসর আসক্তি, নির্যাতন, পর্নোগ্রাফি, অপব্যবহার ও সহিংসতায় ভরা। আমরা আর এ অবস্থা মেনে নেব না। ডিজিটাল ওয়াইল্ড ওয়েস্ট থেকে আমরা তাদের রক্ষা করব।'
নতুন আইনের প্রস্তাব ও শাস্তির হুঁশিয়ারি
পেদ্রো সানচেজের বক্তব্যের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তিনি অবৈধ ও ঘৃণামূলক কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে শাস্তির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি জানান, স্পেনের প্রস্তাবিত আইনের আওতায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অবৈধ বা ঘৃণামূলক কনটেন্ট দ্রুত অপসারণ করতে হবে। এতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ আনা হবে। সেই সঙ্গে অ্যালগরিদমের মাধ্যমে অবৈধ কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়া বা এর বিস্তার ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে ব্যক্তি ও প্ল্যাটফর্ম উভয়কে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।
বিশ্বব্যাপী বিধিনিষেধের তালিকায় স্পেন
আইনটি কার্যকর হলে স্পেন হবে সেই সব অল্প কয়েকটি রাষ্ট্রের একটি, যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষতিকর দিকগুলোর লাগাম টানতে চাইছে। এর আগে গত বছরের ১০ ডিসেম্বর বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের কমবয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। যুক্তরাজ্যও এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করছে। দেশটির পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ হাউস অব লর্ডস ২১ জানুয়ারি ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করার পক্ষে ভোট দেয়। অন্যদিকে ১৫ বছরের নিচে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে ফ্রান্স ও ডেনমার্কও বিধিনিষেধ আরোপের ঘোষণা দিয়েছে।
অন্যান্য দেশের উদ্যোগ ও চ্যালেঞ্জ
নরওয়ে বর্তমান বিধিনিষেধগুলো কাজ করছে না বলে স্বীকার করেছে এবং আরও কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা তৈরির কাজ করছে। চীন শিশুদের জন্য সবচেয়ে কঠোর ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাগুলোর একটি প্রয়োগ করে। ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য দৈনিক স্ক্রিনটাইম ৪০ মিনিটে সীমাবদ্ধ করেছে এবং স্থানীয় সময় রাত ১০টা থেকে পরদিন সকাল ৬টা পর্যন্ত ডিজিটাল প্রবেশাধিকার সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করেছে। টিকটকের বৈশ্বিক ব্যবহারকারী ৫০ কোটির বেশি, এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন টিকটককে তাদের আসক্তিমূলক নকশা পরিবর্তন করতে বলেছে।
সাংস্কৃতিক প্রভাব ও দায়বদ্ধতা
ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ বলেছেন, চীন যেখানে টিকটক ব্যবহার করে বিশ্বজুড়ে শিশুদের মনোযোগ দুর্বল করছে, সেখানে নিজেদের শিশুদের জন্য দৌইনের মাধ্যমে আরও শৃঙ্খলাবদ্ধ ও শিক্ষামুখী কনটেন্ট উপস্থাপন করে। এটি স্পষ্ট করে যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলো কেবল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানই নয়; বরং সাংস্কৃতিক 'সফট পাওয়ার'-এর হাতিয়ার হিসেবেও কাজ করে।
শিশুদের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব
শিশু-কিশোরদের ওপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব মারাত্মক। গবেষণায় দেখা যায়, অতিরিক্ত ব্যবহার ডিপ্রেশন, অ্যাংজাইটি, বিষণ্নতা, ঘুমের সমস্যা, মনোযোগের ঘাটতি, বডি ডিসমর্ফিয়া এবং খাদ্যগ্রহণে সমস্যা তৈরি করে। প্ল্যাটফর্মগুলো নিয়মিতভাবে ব্যবহারকারীদের আচরণ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে, ভবিষ্যৎ আচরণ অনুমান করে এবং লক্ষ্যভিত্তিক বিজ্ঞাপন ও আচরণ প্রভাবিত করার মাধ্যমে সেই তথ্য থেকে মুনাফা করে।
দায়বদ্ধতা ও সমাধানের পথ
বৈশ্বিক এই উদ্যোগগুলো এ কথা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে যে ক্ষতি হচ্ছে, তার পুরো দায় শুধু মা–বাবার ওপর দেওয়া সঠিক নয়; বরং যেসব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম শিশুদের মনোযোগ ধরে রাখার বিনিময়ে অর্থ আয় করছে, এ ক্ষতির দায় তাদেরও বহন করতে হবে। শিশু সুরক্ষার প্রশ্নে রাষ্ট্রকে স্পষ্ট নীতিমালা করতে হবে, প্ল্যাটফর্মগুলোকে বয়সভিত্তিক সুরক্ষা, তথ্য সংগ্রহে সীমা এবং শিশুবান্ধব ডিজাইন বাধ্যতামূলক করতে হবে। একই সঙ্গে স্কুলে ডিজিটাল লিটারেসি এবং পরিবারে সচেতন, সংলাপভিত্তিক অভিভাবকত্ব গড়ে তুলতে হবে।
