প্রথম আলো ভবনে উগ্রবাদী হামলার পর শিল্প প্রদর্শনী: ধ্বংসস্তূপে জেগে উঠেছে সাহসের আলো
গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে, প্রতিহিংসায় উন্মত্ত একদল উগ্রবাদী হামলা চালায় রাজধানীর কারওয়ান বাজারে অবস্থিত দেশের প্রধান গণমাধ্যম প্রথম আলোর ভবনে। তারা ভবনের শাটার ও বড় বড় কাচের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে, লুটপাট চালায় এবং অগ্নিসংযোগ করে। এই হিংস্র আক্রমণে ভবনটি প্রায় ভস্মীভূত হয়ে যায়, এমনকি ফায়ার সার্ভিস ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও বাধা দেওয়া হয়।
হামলার পর প্রথম আলোর দ্রুত পুনরুত্থান
২৬ বছর ধরে সত্য তথ্য প্রচারের ব্রত নিয়ে চলা প্রথম আলোর ছাপা পত্রিকার প্রকাশনা প্রথমবারের মতো ১৯ ডিসেম্বর বন্ধ থাকে। তবে কর্মীদের দৃঢ় প্রত্যয় ও সাহসিকতায় মাত্র ১৭ ঘণ্টার মধ্যে অনলাইন কার্যক্রম পুনরায় শুরু হয়। ২০ ডিসেম্বর সূর্যোদয়ের আলো গায়ে মেখে মুদ্রিত পত্রিকা আবারও পৌঁছে যায় সারা দেশের পাঠকের হাতে, যা প্রতিষ্ঠানের অদম্য চেতনার প্রতীক হয়ে ওঠে।
ধ্বংসস্তূপে 'আলো' শিল্প প্রদর্শনীর সূচনা
এই পুড়ে যাওয়া ভবনেই ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হচ্ছে 'আলো' নামের একটি বিশেষ শিল্পকর্ম প্রদর্শনী। দেশের বিশিষ্ট শিল্পী মাহবুবুর রহমান তাঁর নান্দনিক ভাবনায় দগ্ধ ভবনটিকে শিল্প ও সাহসের আলোয় উদ্ভাসিত করেছেন। প্রদর্শনীটি ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে, প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে ১টা এবং বেলা ৩টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। উদ্বোধনী দিনে বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত খোলা থাকবে।
শিল্পকর্মের বৈশিষ্ট্য ও প্রতীকী অর্থ
শিল্পী মাহবুবুর রহমান ভবনের সামনের দৃশ্যটি পুড়ে যাওয়ার পর যেমন ছিল, তেমনই রেখেছেন। নিচের তলায় দগ্ধ শাটারের ওপর বিশালাকার গ্রাফিতি এঁকেছেন, যা জুলাই বিপ্লবের পর জনমানসের আশা-আকাঙ্ক্ষার অভিব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। প্রদর্শনীতে ব্যবহৃত হয়েছে:
- বাস্তব উপকরণ: পুড়ে যাওয়া বই, আসবাব, ধাতব সামগ্রী ও অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র।
- মাল্টিমিডিয়া: ভিডিও চিত্র, আলোকচিত্র, শব্দ ও আলোর প্রক্ষেপণ।
- ভাস্কর্য ও চিত্রকলা: ধ্বংসস্তূপের মধ্যে পায়রার ঝাঁক, মানুষের অবয়ব ও মিশ্রমাধ্যমের কাজ।
দর্শকরা সিঁড়ি বেয়ে উঠতে গিয়ে দেখবেন ছাই, কয়লা ও ধোঁয়ার দাগ মুছে দেওয়া হয়েছে গোলাপি, হলুদ ও সবুজ রঙের প্রলেপে, যা জীবন, সৃজনশীলতা ও উর্বরতার প্রতীক। শিল্পী জানান, তিনি হামলার ভয়াবহতা ও প্রতিষ্ঠানের পুনরুত্থান—এই দুই বৈপরীত্যকে মিলিয়ে শিল্পের সুষমা সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন।
হামলার পটভূমি ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
প্রথম আলোর প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারী একটি মহল বহুদিন ধরে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। এই হামলার খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে। একই রাতে দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকা অফিস ও ছায়ানট সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানেও হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়, যা সংগঠিত সন্ত্রাসের ইঙ্গিত দেয়।
উগ্রবাদী হামলাকারীরা অন্ধকার থেকে এসে আবারও অন্ধকারে মুখ লুকালেও, প্রথম আলো তার আলো অম্লান রেখেছে। এই শিল্প প্রদর্শনী ধ্বংসের মধ্য থেকে সৃষ্টির শক্তি ও মানবিক চেতনার জয়গান গেয়ে চলেছে, যা সমাজে আশা ও সংহতির বার্তা বহন করে।
