বেইজিং হাফ ম্যারাথনে মানবাকৃতির রোবটের অভূতপূর্ব বিজয়
বহু বছর ধরে রোবট বনাম মানুষের দৌড় প্রতিযোগিতার কল্পনা সায়েন্স ফিকশন সিনেমার পর্দায় সীমাবদ্ধ ছিল, কিন্তু চীনের বেইজিং হাফ ম্যারাথনে সেই কল্পনা এবার বাস্তবে রূপ নিয়েছে। চীনা তৈরি কয়েক ডজন হিউম্যানয়েড বা মানবাকৃতির রোবট এই প্রতিযোগিতায় পেশাদার দৌড়বিদদের পেছনে ফেলে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে, যা প্রযুক্তি জগতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
গত বছরের তুলনায় আমূল পরিবর্তন
গত বছর এই প্রতিযোগিতার উদ্বোধনী আসর ছিল নানা বিড়ম্বনায় পূর্ণ, যখন অধিকাংশ রোবট দৌড় শেষ করতে পারেনি। গত বছরের বিজয়ী রোবটটির সময় লেগেছিল ২ ঘণ্টা ৪০ মিনিট, যা মানুষের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি ছিল। কিন্তু মাত্র এক বছরের ব্যবধানে চিত্রটি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। এবারের প্রতিযোগিতায় ২০টির বদলে অংশ নিয়েছে ১০০টির বেশি রোবট, এবং এর মধ্যে বেশ কয়েকটি রোবট পেশাদার অ্যাথলেটদের চেয়েও ১০ মিনিট আগে দৌড় শেষ করেছে।
বিশ্ব রেকর্ড ভাঙার মাহেন্দ্রক্ষণ
চীনা স্মার্টফোন ব্র্যান্ড অনারের তৈরি বিজয়ী রোবটটি ২১ দশমিক ১ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে সময় নিয়েছে মাত্র ৫০ মিনিট ২৬ সেকেন্ড। মজার বিষয় হলো, এটি উগান্ডার দৌড়বিদ জ্যাকব কিপ্লিমোর গড়া বর্তমান বিশ্ব রেকর্ডের ৫৭ মিনিট ২০ সেকেন্ড চেয়েও প্রায় ৭ মিনিট দ্রুত সময় নিয়েছে। অনারের প্রকৌশলী ডু শিয়াওদি জানান, এই রোবট এক বছর ধরে গবেষণার মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে, যেখানে অভিজাত দৌড়বিদদের অনুকরণে রোবটটির পা ৯০ থেকে ৯৫ সেন্টিমিটার লম্বা করা হয়েছে।
প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও এআইয়ের ভূমিকা
রোবটটিতে স্মার্টফোনে ব্যবহৃত তরল শীতলীকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, যা দৌড়ানোর সময় উৎপন্ন হওয়া প্রচণ্ড তাপ নিয়ন্ত্রণ করে। প্রতিযোগিতায় প্রায় ৪০ শতাংশ রোবট রিমোট কন্ট্রোল ছাড়াই সেন্সর এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে নিজেদের পথ চিনে নিয়েছে। বেইজিং পোস্ট অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশনস ইউনিভার্সিটির প্রকৌশল বিভাগের গবেষক চু তিয়ানকি বলেন, 'রোবটগুলোর দৌড়ানোর ভঙ্গি ছিল অবিশ্বাস্য। এআই প্রযুক্তি বিকাশের খুব অল্প সময়ের মধ্যে এই পর্যায়ের দক্ষতা অর্জন আমাকে অভিভূত করেছে। ভবিষ্যতে যারা এআই ব্যবহারে পারদর্শী হবে না, তারা নিশ্চিতভাবেই পিছিয়ে পড়বে।'
ভবিষ্যত সম্ভাবনা ও বাজার অবস্থান
হিউম্যানয়েড রোবট বা যন্ত্রমানবদের এই শারীরিক সক্ষমতা বিপজ্জনক কাজ থেকে শুরু করে যুদ্ধক্ষেত্র পর্যন্ত সবখানেই বিপ্লব ঘটাতে পারে। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, দৌড় প্রতিযোগিতায় জয়ী হওয়া আর কারখানায় সূক্ষ্ম কাজ করা এক কথা নয়। চীনা রোবটিকস সংস্থা এখনো এমন এআই সফটওয়্যার তৈরিতে কাজ করছে, যা একজন মানুষের মতো নিপুণভাবে কারখানার সূক্ষ্ম কাজ করতে পারবে। চীন বর্তমানে হিউম্যানয়েড রোবট বিক্রিতে বিশ্ববাজারে শীর্ষে রয়েছে, যেখানে এজিবট, ইউনিট্রি ও ইউবিটেকের মতো প্রতিষ্ঠান গত এক বছরে হাজার হাজার রোবট ইউনিট সরবরাহ করেছে।
এই ঘটনা প্রমাণ করে যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং রোবটিকস প্রযুক্তি কত দ্রুত এগিয়ে চলেছে, এবং ভবিষ্যতে এটি মানব জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গভীর প্রভাব ফেলবে।



