সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যাপক ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ক্রমাগত বাড়ছে। সম্প্রতি হোয়াটসঅ্যাপ প্যারেন্ট ম্যানেজড অ্যাকাউন্ট চালু করেছে, যা ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের অ্যাকাউন্টে অভিভাবকদের নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দিচ্ছে। এই পদক্ষেপটি শিশু সুরক্ষায় একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অভিভাবকদের উদ্বেগ ও হোয়াটসঅ্যাপের প্রতিক্রিয়া
কলকাতার নিউটাউনের বাসিন্দা পিউ দাস বলেন, ‘আমার ১২ বছরের ছেলের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে অ্যাডাল্ট মিম শেয়ার করা দেখে আমি হতভম্ব হয়ে পড়েছিলাম।’ একইভাবে দক্ষিণ কলকাতার এক নারী জানান, তার ছেলের গ্রুপে নায়িকার মর্ফড ছবি শেয়ার করা হয়েছিল, যার নিচের মন্তব্য পড়ে তিনি বিশ্বাস করতে পারেননি যে ১২-১৩ বছরের শিশুরা এমন কথা বলতে পারে।
এই ধরনের ঘটনাগুলো নতুন নয় বলে বিশেষজ্ঞরা মত দেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব, বিশেষত নাবালকদের সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগই হোয়াটসঅ্যাপকে প্যারেন্ট ম্যানেজড অ্যাকাউন্ট চালু করতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
প্যারেন্ট ম্যানেজড অ্যাকাউন্ট কীভাবে কাজ করে?
এই অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে অভিভাবকরা ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট তৈরি ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। শিশুদের মেসেজ, কলিং, প্রাইভেসি সেটিংসসহ বিভিন্ন ফিচার অভিভাবকদের হাতে থাকবে।
অ্যাকাউন্ট সেটআপ করতে হোয়াটসঅ্যাপ ইনস্টল করে শিশুর বয়স ও ফোন নম্বর দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। এরপর কিউআর কোড স্ক্যান করে অভিভাবকের অ্যাকাউন্টের সঙ্গে লিঙ্ক করতে হবে এবং একটি ছয় ডিজিটের পিন সেট করতে হবে। এই পিন দিয়েই সমস্ত নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা যাবে।
নিয়ন্ত্রণের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো
- শুধুমাত্র ফোনের কন্ট্যাক্ট লিস্টে সেভ করা নম্বরের সঙ্গেই যোগাযোগ করা যাবে।
- নতুন নম্বর থেকে যোগাযোগ করতে চাইলে অভিভাবকের অনুমতি প্রয়োজন।
- অপরিচিত নম্বর প্রোফাইল ছবি বা ‘লাস্ট সিন’ দেখতে পারবে না।
- কোনো গ্রুপে যোগ দিতে চাইলে অভিভাবকের অনুমোদন লাগবে।
- মেটা এআই ফিচার, চ্যানেল, স্ট্যাটাস আপডেট, ভিউ ওয়ান্স মেসেজের মতো ফিচার বন্ধ থাকবে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সৌম্যক সেনগুপ্ত বলেন, ‘অ্যাকাউন্ট তৈরির সময় শুধু জন্ম তারিখ জিজ্ঞাসা করা শিশু সুরক্ষার জন্য যথেষ্ট নয়, কারণ ভুল তারিখ দেওয়া সহজ। প্যারেন্টাল কন্ট্রোল ও সেফটি টুলস এই ক্ষেত্রে সাহায্য করে।’
সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ পুলকিত গর্গ উল্লেখ করেন, ‘চ্যানেলগুলোর কন্টেন্ট শিশুদের জন্য উপযোগী নয়, এবং মেটা এআই-এর উত্তরের ভিত্তিতে বাচ্চারা ওষুধ খেয়ে ফেলার উদাহরণও আছে। তবে জরুরি অবস্থায় লোকেশন শেয়ার করার মতো ফিচার এই অ্যাকাউন্টে নেই, যা একটি সীমাবদ্ধতা।’
শিশু অধিকার বিশেষজ্ঞ সত্যগোপাল দে বলেন, ‘ডিজিটাইজেশনের যুগে শিশুদের ইন্টারনেট থেকে দূরে রাখা সম্ভব নয়, কিন্তু প্যারেন্টাল কন্ট্রোল বিষয়টিকে সহজ করে। শিশুদের নিরাপত্তা ও বয়স অনুযায়ী অ্যাপ ব্যবহার শেখানো দরকার।’
অভিভাবকদের প্রতিক্রিয়া
হাওড়ার বাসিন্দা রিনা দাস বলেন, ‘ডিজিটাইজেশনের যুগে লাগাম টানা কঠিন। হোয়াটসঅ্যাপে নিয়ন্ত্রণ পাওয়া গেলে সত্যিই ভাল হবে।’ দক্ষিণ কলকাতার এক অভিভাবক জানান, তার মেয়ে বুলিং-এর শিকার হয়েছিল, কিন্তু চ্যাট ডিলিট করে দিত বলে তা জানতে পারেননি।
পেরেন্টিং কনসালট্যান্ট পায়েল ঘোষ বলেন, ‘অনেক অভিভাবক শিশুদের চ্যাট পড়ে বিশ্বাস করতে পারেন না যে তাদের সন্তান এমন কথা বলতে পারে। তাই নজরদারি প্রয়োজন, তবে ব্যালেন্স বজায় রাখতে হবে, নাহলে শিশুরা যোগাযোগ বন্ধ করে দেবে।’
সামগ্রিক মূল্যায়ন
হোয়াটসঅ্যাপের প্যারেন্ট ম্যানেজড অ্যাকাউন্ট শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণই যথেষ্ট নয়, শিশুদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করে অনলাইন ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করা এবং দায়িত্বশীল ব্যবহার শেখানো অপরিহার্য। এই উদ্যোগটি বিশ্বব্যাপী শিশু সুরক্ষা আলোচনাকে আরও জোরদার করবে বলে আশা করা হচ্ছে।



