চীনে জন্মহার হ্রাস: রোবট বিপ্লবের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা
চীনের জন্মহার ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে, যা দেশটির অর্থনীতিতে কয়েক দশকের মধ্যে বড় ধরনের ধাক্কার আশঙ্কা তৈরি করছে। বিশাল শ্রমশক্তির আকার কমে যাওয়া এবং পেনশনভোগী বৃদ্ধ মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি এই সংকটকে ত্বরান্বিত করছে। চীনা সরকার নানা চেষ্টা সত্ত্বেও জন্মহার হ্রাসের ধারা কমাতে পারেনি, ফলে একটি সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে রোবট ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির দিকে নজর দিচ্ছে।
রোবট ও এআই: অর্থনৈতিক রক্ষাকবচ
দেশটির প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং বহু বছর ধরে উৎপাদন খাত আধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় করার উদ্যোগ নিয়েছেন। এখন এই প্রযুক্তি উন্নয়নের পরিকল্পনা জনসংখ্যার ভারসাম্য বদলে যাওয়ার সমস্যার সঙ্গে মিলছে। হংকং ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির জনসংখ্যাবিদ স্টুয়ার্ট গিটেল বাস্টেন সতর্ক করে বলেছেন, চীন যদি গত ২০-৩০ বছরের মতো একইভাবে চলতে থাকে, তাহলে বড় সংকট তৈরি হবে। কারণ, তাদের জনসংখ্যা কাঠামো ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে বড় অসামঞ্জস্য দেখা দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মত দিচ্ছেন যে, সঠিকভাবে সামলানো গেলে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চীনের অর্থনীতিকে বড় ধসের হাত থেকে অন্তত কয়েক দশক রক্ষা করতে পারে। তবে উচ্চপ্রযুক্তিতে রূপান্তর সহজ নয়; এতে স্বল্প মেয়াদে চাকরি কমতে পারে এবং দীর্ঘ মেয়াদে কাজের ধরন বদলে যাবে। ১৪০ কোটির মানুষের দেশে এই পরিবর্তন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
রোবট বিপ্লবের বর্তমান অবস্থা
বর্তমানে চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় শিল্প খাতের রোবটের বাজার। ২০২৪ সালে বিশ্বে স্থাপন করা মোট রোবটের অর্ধেকের বেশি চীনে বলে আন্তর্জাতিক রোবট ফেডারেশন জানিয়েছে। এই উচ্চমাত্রার স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিই চীনের কারখানাগুলোকে বড় পরিসরে ও কম দামে বৈদ্যুতিক গাড়ি ও সৌর প্যানেল উৎপাদনে সক্ষম করছে, যা বিশ্ববাজারে দেশটির বাণিজ্য–উদ্বৃত্ত বাড়াচ্ছে।
চীন মানুষের মতো রোবটেও বড় বিনিয়োগ করছে। বর্তমানে ১৪০টির বেশি কোম্পানি এ ধরনের রোবট তৈরি করছে, এবং কিছু রোবট ইতিমধ্যে উৎপাদন, লজিস্টিক ও গবেষণাগারে পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। নির্মাতারা বলছেন, রোবটগুলো এখনো পুরোপুরি মানুষের মতো উৎপাদনশীল হয়নি, তবে পণ্য বাছাই ও মান পরীক্ষা করার মতো কাজে দ্রুত উন্নতি করছে।
ঝুঁকি ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ
সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইস্ট এশিয়া ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক বার্ট হফম্যান বলেন, জনসংখ্যা হ্রাস যখন চীনের অর্থনীতির বিরুদ্ধে যেতে শুরু করেছে, তখন স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ও এআই উৎপাদনশীলতা বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে সবকিছু কীভাবে হবে তা অনিশ্চিত, বিশেষ করে চলতি শতকের শেষ ভাগে চীনের জনসংখ্যা আরও দ্রুত কমবে।
অধ্যাপক হফম্যান সতর্ক করেছেন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির চেয়ে যদি শ্রমশক্তি কমার গতি বেশি হয়, তাহলে ২০৭০ সালের পর চীন পিছিয়ে পড়তে পারে। আরেকটি সমস্যা হলো, উৎপাদনশীলতা বাড়লেই যে সবার চাকরি থাকবে, এমন নয়; হয়তো কম মানুষ দিয়েই বেশি কাজ হবে। চীনে ইতিমধ্যে কিছু খাতে শ্রমিকের ঘাটতি আছে, আবার কিছু খাতে বেকারত্ব রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই ও রোবট চীনের উৎপাদন খাতের প্রায় ৭০ শতাংশ শ্রমিককে প্রভাবিত করতে পারে। হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক গুওজুন হে বলেছেন, 'স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা দীর্ঘ মেয়াদে সমস্যা সমাধানের অংশ, কিন্তু স্বল্প ও মধ্য মেয়াদে সঠিকভাবে পরিচালনা না করলে অনেক শ্রমিক চাকরি হারাতে পারেন। এতে সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপ বাড়বে।'
এ জন্য শ্রমিকদের নতুন দক্ষতা শেখাতে বড় বিনিয়োগ দরকার, যাতে তাঁরা স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার সঙ্গে কাজ করতে পারেন। পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থাকেও শক্তিশালী করতে হবে, যাতে চাকরি বদল, স্থান পরিবর্তন বা বেকারত্বের সময় মানুষ সহায়তা পায়। অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফিলিপ ওকিফ বলেন, জন্মহার কমে যাওয়া সমাজে বড় প্রভাব ফেলবে, তবে জনসংখ্যা ও কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমবে, ফলে মানিয়ে নেওয়ার জন্য সময় আছে।
