ঢাকায় এআই ক্যামেরায় এক মাসে ৬৮৯ মামলা, বাসের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ
ঢাকায় এআই ক্যামেরায় এক মাসে ৬৮৯ মামলা, বাসের শীর্ষে

ঢাকার বিভিন্ন মোড়ে এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। এই ক্যামেরাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা শনাক্ত করে এবং নিয়মিত জরিমানা আরোপ করছে। গত এক মাসে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ৬৮৯টি যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। সবচেয়ে বেশি জরিমানার মুখে পড়েছে বাসগুলো।

কী কী অপরাধ ধরা পড়ছে

ট্রাফিক বিভাগ জানিয়েছে, নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলেই মামলা দেওয়া হচ্ছে। উল্টো পথে গাড়ি চালানো, সিগন্যাল অমান্য করা, জেব্রা ক্রসিংয়ে গাড়ি উঠিয়ে দেওয়া, স্টপ লাইন না মানা, বাঁ লেন বন্ধ করে রাখা, হেলমেট না পরা, যত্রতত্র গাড়ি থামিয়ে সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা, ফুটপাতে গাড়ি চালানো এবং অবৈধ পার্কিং-কে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

৭ মে থেকে ১ জুন পর্যন্ত মামলার পরিসংখ্যান

ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার বিভিন্ন মোড়ে গত ৭ মে পরীক্ষামূলকভাবে এআই ক্যামেরা স্থাপনের পর ১ জুন পর্যন্ত ৬৮৯টি যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩১২টি মামলা হয়েছে বাসের বিরুদ্ধে। একই সময়ে ব্যক্তিগত গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ১৫০টি। বাকি ২২৭টি মামলা হয়েছে মোটরসাইকেল, পিকআপ, লেগুনা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার বিরুদ্ধে। নিয়ম ভাঙার সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল মোড়ে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কীভাবে কাজ করছে এআই ক্যামেরা

ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ জানিয়েছে, শুরুতে ঢাকার ৩০টি মোড়ে এআই প্রযুক্তির পিটিজেড (প্যান-টিল্ট-জুম) ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। পরে আরও ক্যামেরা বসানো হয়েছে। এখন মোট ১১০টি এআই ক্যামেরা থেকে ভিডিও চিত্র সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরতে সক্ষম এই ক্যামেরাগুলো চলন্ত বস্তু বা ব্যক্তিকে অনুসরণ করতে পারে। এ ছাড়া কম্পিউটার বা মুঠোফোনের অ্যাপের মাধ্যমে সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়। অপটিক্যাল জুমের মাধ্যমে অনেক দূর থেকে স্পষ্ট ছবি বা গাড়ির নম্বরপ্লেট শনাক্ত করতে পারে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সফটওয়্যার স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা শনাক্ত করে। বিআরটিএর সার্ভারে থাকা তথ্যের ভিত্তিতে গাড়ির তথ্য ডিএমপির সার্ভারে পাঠানো হয়। পরে দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যরা তা যাচাই করে সংশ্লিষ্ট গাড়ির মালিকের নামে মামলা দায়ের করেন। মামলার নোটিশ ডাকযোগে পাঠানো হচ্ছে।

নগরবাসীর সাড়া

ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, রাজধানীতে ট্রাফিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে নগরবাসী অভূতপূর্ব সাড়া দিয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যেই সড়কে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এমনকি ঈদের ছুটিতে যানবাহন কম থাকলেও অনেককে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ট্রাফিক আইন মেনে চলতে দেখা গেছে।

বাসের বিরুদ্ধে বেশি মামলা

ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, এআই ক্যামেরার মাধ্যমে এখন পর্যন্ত হওয়া মামলার প্রায় ৭০ শতাংশই হয়েছে সড়কে যানবাহন থামিয়ে প্রতিবন্ধকতা বা যানজট সৃষ্টি করার অভিযোগে। ২০ শতাংশ মামলা হয়েছে বাঁ লেন দখল করে রাখার কারণে। আর বাকি ১০ শতাংশ মামলা হয়েছে উল্টো পথে গাড়ি চালানো, সিগন্যাল অমান্যসহ অন্যান্য অপরাধে।

এআই ক্যামেরার মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়ে। এরপর রয়েছে জাহাঙ্গীরগেট, বিজয় সরণি ও বাংলামোটর মোড়।

ডিএমপি ট্রাফিকের জ্যেষ্ঠ সিস্টেম অ্যানালিস্ট শারমিন আফরোজ বলেন, "অপরাধ বিবেচনায় সব ধরনের যানবাহনের বিরুদ্ধেই মামলা হয়েছে। তবে সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অপরাধে মামলা বেশি হয়েছে। আর যানবাহনের মধ্যে বাসের বিরুদ্ধেই সবচেয়ে বেশি জরিমানা করা হয়েছে।"

কোন অপরাধে কত জরিমানা

ট্রাফিক বিভাগ জানিয়েছে, এআই ক্যামেরার মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ২৯ লাখ টাকার বেশি জরিমানা করা হয়েছে। নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে নাগরিকদের মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিতে শুরুতে তুলনামূলক নমনীয় অবস্থানে আছে পুলিশ। তবে ধাপে ধাপে প্রয়োগ কঠোর করা হবে।

ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, এআই প্রযুক্তিতে সড়ক পরিবহন আইনের সাতটি ধারা ও চারটি উপধারায় জরিমানা করা হচ্ছে। এআই প্রযুক্তিতে মামলার ক্ষেত্রে জরিমানার পরিমাণও কিছুটা কমানো হয়েছে। পাশাপাশি যানবাহনগুলোকে বড় ও ছোট দুই ভাগে ভাগ করে জরিমানার হার ঠিক করা হয়েছে। অনেকেই জরিমানা পরিশোধও করেছেন।

ট্রাফিক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকা বা মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্স ব্যবহার করার অপরাধে প্রথমবার বড় গাড়ির (ব্যক্তিগত গাড়ি, বাস, ট্রাক, লেগুনা) ক্ষেত্রে ৫ হাজার টাকা এবং ছোট গাড়ির ক্ষেত্রে ৪ হাজার টাকা জরিমানা করা হচ্ছে। গাড়ির ফিটনেস না থাকা, মেয়াদোত্তীর্ণ ফিটনেস, অনুমতি ছাড়া গাড়ির রং পরিবর্তন করার অপরাধে বড় গাড়ির ক্ষেত্রে প্রথমবার ১০ হাজার টাকা এবং ছোট গাড়ির ক্ষেত্রে ৩ হাজার টাকা জরিমানা হচ্ছে। রেজিস্ট্রেশন না থাকা বা রেজিস্ট্রেশন থাকা সত্ত্বেও নম্বরপ্লেট ব্যবহার না করার অপরাধে বড় ও ছোট গাড়ির ক্ষেত্রে প্রথমবার ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হচ্ছে।

বেপরোয়া গাড়ি চালানো, বাঁ লেন বন্ধ করা, গাড়ির ভাঙা কাচ ব্যবহার, নির্দেশক বাতি না থাকা এবং সড়কে চলাচল অনুপযোগী গাড়ি (নসিমন, করিমন, ইজিবাইক, মোটরচালিত অটোরিকশা) চালানোর অপরাধে প্রথমবার ২ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করা হচ্ছে। গাড়ি থামিয়ে প্রতিবন্ধকতা বা যানজট সৃষ্টি করা, উল্টো পথে গাড়ি চালানো, মোটরসাইকেলে দুজনের বেশি চড়া, হেলমেট না পরা, চলন্ত অবস্থায় যাত্রী ওঠানো-নামানো, গাড়ি চালানোর সময় মুঠোফোনে কথা বলা, সিটবেল্ট না বাঁধা, ফুটপাতে গাড়ি চালানো এবং সিগন্যাল বাতি অমান্য করার অপরাধে প্রথমবার ছোট গাড়ির জন্য ১ হাজার টাকা এবং বড় গাড়ির জন্য ৩ হাজার টাকা জরিমানা করা হচ্ছে। একই অপরাধ বারবার করতে থাকলে প্রথমবারের তুলনায় দ্বিগুণ জরিমানা গুনতে হবে।

অস্পষ্ট নম্বরপ্লেটের বিরুদ্ধে অভিযান

ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, ক্যামেরা বসানোর পরও ঢাকার সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। নিবন্ধন না থাকায় ক্যামেরায় আইন লঙ্ঘনের বিষয়টি ধরা পড়লেও মামলা দেওয়া যাচ্ছে না। এ ছাড়া অনেক যানবাহনের নম্বরপ্লেট অস্পষ্ট, আবার কিছু যানবাহনে নম্বরপ্লেট নেই। এ কারণে ক্যামেরা সেসব যানবাহন শনাক্ত করতে পারছে না।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) আনিছুর রহমান বলেন, "শিগগিরই অস্পষ্ট, ভাঙা বা অপাঠ্য নম্বরপ্লেটের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চালানো হবে। আইন অনুযায়ী নম্বরপ্লেট স্পষ্ট ও পাঠযোগ্য রাখা বাধ্যতামূলক।" তিনি আরও বলেন, "নিয়মিত অভিযান ও মামলা অব্যাহত আছে। তবে বিপুলসংখ্যক যানবাহন জব্দ করে রাখার মতো পর্যাপ্ত অবকাঠামো পুলিশের নেই। সে কারণে আইনগত ব্যবস্থা ও জরিমানার মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে।"

আনিছুর রহমান আরও জানান, "২০ থেকে ২৫ বছরের বেশি পুরোনো বাস ও ট্রাক পর্যায়ক্রমে সড়ক থেকে সরিয়ে নেওয়ার জন্যও নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে। সংশ্লিষ্ট নীতিমালা কার্যকর হলে রাজধানীর সড়ক থেকে বিপুলসংখ্যক পুরোনো ও অনুপযোগী যানবাহন অপসারণ করা সম্ভব হবে।"

এআই মামলার নামে প্রতারণা

এআই ক্যামেরায় মামলা শুরুর পর নতুন একধরনের প্রতারণার অভিযোগও সামনে এসেছে। জরিমানার নোটিশের নামে মুঠোফোনে ভুয়া খুদে বার্তা পাঠিয়ে টাকা আদায়ের চেষ্টা করছে একটি প্রতারক চক্র। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন এ ধরনের ভুয়া বার্তা পেয়েছেন বলে জানা গেছে।

"জরিমানা পরিশোধ-সংক্রান্ত চূড়ান্ত বিজ্ঞপ্তি" শিরোনামের ওই ভুয়া বার্তায় জরিমানা নম্বর, তারিখ, অপরাধের ধরন, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জরিমানা পরিশোধ না করলে শাস্তির বিষয়টি উল্লেখ করা হচ্ছে। এ ছাড়া জরিমানা পরিশোধের সময়সীমা জানিয়ে একটি লিংকও পাঠানো হচ্ছে। লিংকে প্রবেশ করলে জরিমানার পরিমাণ দেখা যাচ্ছে।

তবে ডিএমপির পক্ষ থেকে এমন কোনো বার্তা পাঠানো হচ্ছে না জানিয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা। গত ২৫ মে এ-সংক্রান্ত একটি সতর্কবার্তা জারি করেছে ডিএমপি। পুলিশের ওই সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, "ইদানীং ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ থেকে জরিমানা করা হয়েছে নগরবাসী এমন খুদে বার্তা (এসএমএস) পাচ্ছেন। ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ সুস্পষ্টভাবে জানাচ্ছে, এই খুদে বার্তা সম্পূর্ণ বানোয়াট ও অসত্য।"

সতর্কবার্তায় ডিএমপি আরও বলছে, "ট্রাফিক আইন অমান্যকারী যানবাহনে মামলা দেওয়া হলে মালিক বা চালকের ঠিকানায় শুধু দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার স্বাক্ষর করা একটি পত্র পাঠানো হচ্ছে। আর শুধু ০১৩২০-০৪২২০৭ ও ০১৩২০-০৪২২২৭ মুঠোফোন নম্বর থেকে খুদে বার্তা পাঠানো হবে। তবে এখনো মুঠোফোনের মাধ্যমে বার্তা পাঠানো শুরু হয়নি। মামলাসংক্রান্ত কোনো তথ্য জানতে উল্লিখিত দুটি নম্বরের পাশাপাশি জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর '৯৯৯'-এ যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।"

আনিছুর রহমান বলেন, "ডিএমপির পক্ষ থেকে নির্ধারিত দুটি সরকারি নম্বর ছাড়া অন্য কোনো নম্বর থেকে পাঠানো বার্তার ভিত্তিতে কেউ যেন বিভ্রান্ত না হন। কোনো অবস্থাতেই ডিএমপি নাগরিকদের কাছে পাসওয়ার্ড, ওটিপি বা ব্যক্তিগত তথ্য চাইবে না। ডিএমপির পক্ষ থেকে পাঠানো নোটিশে সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তার স্বাক্ষর থাকবে।"