গবাদিপশুতে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার ভয়াবহ আকার ধারণ করছে
গবাদিপশুতে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার ভয়াবহ আকার ধারণ করছে

সরকার হস্তক্ষেপ না করলে আগামী ১৫ বছরে গবাদিপশুর খামারে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেড়ে যাবে। এর ফলে মানবদেহে অতিপ্রয়োজনীয় ওষুধের কার্যকারিতার ওপর ভয়াবহ প্রভাব পড়তে পারে। নতুন বৈশ্বিক গবেষণায় এমন উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে।

অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধের অপব্যবহার

বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই গবাদিপশু পালনে ব্যবহার করা হয়। অনেক দেশে এই ওষুধের ব্যবহারের ওপর তেমন কোনো নজরদারি নেই। কিছু খামারে পশুকে নিয়মিত এই ওষুধ খাওয়ানো হয়। এমনকি অনেক দেশে মাংস উৎপাদনের জন্য পালিত পশুর দ্রুত বৃদ্ধির জন্যও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধ ব্যবহার করেন খামারিরা।

সুপারবাগ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ এটি। সুপারবাগের কারণে ক্রমশ প্রতিরোধী হয়ে ওঠা রোগগুলোর বিরুদ্ধে অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের (এএমআর) কারণে বর্তমানে শুধু ইউরোপেই বছরে প্রায় এক হাজার ১০০ কোটি ইউরো (৯৫০ কোটি পাউন্ড) ক্ষতি হচ্ছে। ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী এই ক্ষতির পরিমাণ এক লাখ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা

সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে এই অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের (এএমআর) কারণে কোটি কোটি মানুষের মৃত্যু হতে পারে। এ ছাড়া হিপ রিপ্লেসমেন্টের মতো সাধারণ অস্ত্রোপচারগুলোও তখন জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ হয়ে উঠবে।

খামারে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমানোর সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলো বেশ কাজে দিয়েছিল। ২০১৩ সালের সর্বোচ্চ ব্যবহারের তুলনায় এই ওষুধের পরিমাণ প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমিয়ে এনেছিলেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। কিন্তু মাংসের ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক চাহিদা ও আইনের শিথিলতার কারণে এই অগ্রগতি এখন হুমকির মুখে। পশুর দ্রুত বৃদ্ধির জন্য খামারিরা আবারও অ্যান্টিবায়োটিকের দিকে ঝুঁকছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এফএওর প্রতিবেদন

গতকাল বুধবার জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিষয়টি উঠে এসেছে। সংস্থাটি বলছে, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৪০ সালের মধ্যে প্রতিবছর গবাদিপশুকে এক লাখ ৪৩ হাজার টনের বেশি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধ প্রয়োগ করা হবে। এটি ২০১৯ সালের তুলনায় ৩০ শতাংশ বেশি। এমনকি এটি ২০১৩ সালের সর্বোচ্চ রেকর্ডকেও (এক লাখ ১৮ হাজার থেকে এক লাখ ৩০ হাজার টন) ছাড়িয়ে যাবে।

তবে প্রতিবেদনের রচয়িতারা বলছেন, এই পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব। কৃষকদের ও মাংস উৎপাদনকারীদের আরও উন্নত পদ্ধতি শেখানো যেতে পারে। এতে কৃত্রিমভাবে পশু বৃদ্ধির প্রয়োজন কমবে। পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ করাও সহজ হবে।

অর্থনৈতিক প্রভাব

বর্তমানে উৎপাদকেরা এক দুষ্টচক্রে আটকে পড়েছেন। কারণ, অ্যান্টিবায়োটিকের বেশি ব্যবহারের ফলে ওষুধের প্রতি জীবাণুর প্রতিরোধক্ষমতা আরও বেড়ে যায়। এর ফলে ২০৪০ সালের মধ্যে শুধু গবাদিপশু খাতেই মোট ক্ষতির পরিমাণ ৩১ হাজার ৮০০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে। অথচ পশুর বৃদ্ধির জন্য অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করতে খরচ হবে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৩০০ কোটি ডলার।

এই বিষয়ে বিভিন্ন দেশের সরকারকে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ‘অ্যালায়েন্স টু সেভ আওয়ার অ্যান্টিবায়োটিকস (এএসওএ)’-এর প্রতিনিধি কোইলিন নুনান। তবে তিনি এফএওর ওই প্রতিবেদনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। দ্য গার্ডিয়ানকে তিনি বলেন, ‘অ্যান্টিবায়োটিকের সবচেয়ে বাজে অপব্যবহার হলো পশুর বৃদ্ধির জন্য এটি ব্যবহার করা। এই প্রথা বন্ধ করতে গেলে কিছু খরচ তো হবেই।’

নুনান আরও বলেন, ‘কিন্তু এফএওর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গবাদিপশুতে অ্যান্টিবায়োটিক–প্রতিরোধী ক্ষমতা বাড়লে এর অর্থনৈতিক প্রভাব আরও ভয়াবহ ও দীর্ঘস্থায়ী হবে। এর ফলে উৎপাদন কমবে এবং খাদ্যের দাম বেড়ে যাবে।’

সরকারের ভূমিকা

এফএও মনে করে, অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতাকে বৈশ্বিক জনসম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। তাই গুরুত্বপূর্ণ এই ওষুধের অতিরিক্ত ব্যবহার রোধে সরকারগুলোকে অবশ্যই পদক্ষেপ নিতে হবে।

নুনান বলেন, ‘সমাধান হলো—খামারে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে আরও ভালো নীতিমালা প্রণয়ন করা। পাশাপাশি পশুর রোগ কমানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা। আমাদের মতে, গাদাগাদি করে রাখা, অস্বাস্থ্যকর ও পশুর জন্য পীড়াদায়ক খামার ব্যবস্থা থেকে সরে আসতে হবে। এর বদলে স্বাস্থ্যসম্মত খামার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে অ্যান্টিবায়োটিকের খুব একটা প্রয়োজনই পড়বে না।’

আমদানি নিষেধাজ্ঞা

দ্রুত বৃদ্ধির ওষুধ প্রয়োগ করে উৎপাদিত মাংস আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞার জন্য যুক্তরাজ্য সরকারের প্রতিও আহ্বান জানিয়েছে এএসওএ। ব্রেক্সিটের পর খামারে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের মানদণ্ড ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। অন্যদিকে ইইউ তাদের নিয়মকানুন শিগগিরই আরও কঠোর করতে যাচ্ছে।

পশুর বৃদ্ধির জন্য অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার ইইউ ও যুক্তরাজ্যে ২০০৬ সাল থেকেই নিষিদ্ধ। তবে কিছু ক্ষেত্রে আমদানি চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল। আগামী সেপ্টেম্বর মাস থেকে ইইউ অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগে উৎপাদিত সব ধরনের মাংস, দুগ্ধজাত পণ্য ও ডিম আমদানি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করতে যাচ্ছে।

নুনান বলেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে দায়িত্বহীনভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারকারী দেশগুলোর ওপর তাদের মান বাড়াতে চাপে পড়ছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি ব্রাজিলের কথা উল্লেখ করেন। দেশটি ইতিমধ্যেই এ ধরনের ওষুধের ওপর নিজেদের নিয়মকানুন কঠোর করছে।

যুক্তরাজ্যকেও একই ধরনের নিয়ম চালু করার আহ্বান জানান নুনান। তিনি বলেন, ‘পশুর বৃদ্ধিতে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের বিরুদ্ধে ইইউর এই নিষেধাজ্ঞা জনস্বাস্থ্য রক্ষায় সাহায্য করবে। পাশাপাশি এটি কৃষকদের অসম প্রতিযোগিতার হাত থেকেও বাঁচাবে। ভোক্তা ও কৃষকদের সুরক্ষায় যুক্তরাজ্য সরকারেরও উচিত একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা।’

নুনান আরও বলেন, ‘যুক্তরাজ্য ও ইইউর মধ্যে স্বাস্থ্য ও উদ্ভিদ স্বাস্থ্যবিধি (স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি) নিয়ে নতুন চুক্তির আলোচনা চলছে। এর মাধ্যমে খামারে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের মানদণ্ডের বিষয়ে ইইউর সঙ্গে এক কাতারে আসার এক আদর্শ সুযোগ পেয়েছে যুক্তরাজ্য।’