আন্তর্জাতিক মাদক পাচারকারী সিন্ডিকেটগুলো কোকেন পাচারের জন্য বাংলাদেশকে ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করছে। জাতিসংঘের অধীন সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল নারকোটিক্স কন্ট্রোল বোর্ডের (আইএনসিবি) ২০২৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের বৈশ্বিক মাদক পাচার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় কোকেনের নতুন বাজার
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ আমেরিকায় কোকেন উৎপাদন রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছানোর পর পাচারকারীরা নতুন বাজার ও রুট খুঁজতে শুরু করেছে। সেই নতুন গন্তব্যগুলোর একটি দক্ষিণ এশিয়া। কলম্বিয়া, পেরু ও বলিভিয়ায় উৎপাদিত কোকেন প্রথমে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে পৌঁছায়। সেখান থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের সদস্যরা আকাশপথে বাংলাদেশে কোকেন নিয়ে আসে। বাংলাদেশকে ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করে এসব মাদকের একটি অংশ দক্ষিণ এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাচার করা হয়। দক্ষিণ এশিয়া এখন শুধু ট্রানজিট অঞ্চল নয়, ধীরে ধীরে কোকেনসেবীদের বাজারেও পরিণত হচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশেও কোকেন ব্যবহারের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
চার বছরে ১০টি কোকেন চালান ধরা
আইএনসিবির প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য নিয়ে প্রথম আলো কথা বলেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উচ্চপর্যায়ের দুজন কর্মকর্তার সঙ্গে। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে দেশে অন্তত ১০টি কোকেনের চালান ধরা পড়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনেও কোকেন পাচারের বিষয়টি এসেছে। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হাসান মারুফ প্রথম আলোকে বলেন, “যেসব দেশ থেকে মাদক আসছে, সেসব দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়, যাতে তারাও ব্যবস্থা নিতে পারে।”
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আন্তর্জাতিক মাদক পাচারকারী চক্রগুলো বাংলাদেশকে কোকেন পাচারের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করছে। আফ্রিকার দেশ মালাউ, নাইজেরিয়া, তানজানিয়া এবং ক্যামেরুনের কয়েকজন নাগরিক কোকেন পাচারের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অপরাধে বাংলাদেশে গ্রেপ্তার হয়েছেন। গ্রেপ্তার হওয়া ওই চার দেশের নাগরিকেরা মূলত আকাশপথে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিলেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে কোকেন পাচার করা।
২০২৪-২৫ সালে কোকেন জব্দের পরিসংখ্যান
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে প্রায় ১৩০ কেজি কোকেন ধরা পড়েছে। তবে ২০২৫ সালে ধরা পড়েছে ১৪.৬৫১ কেজি। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় রাসায়নিক পরীক্ষাগারে ২০২৫ সালে কোকেনের ৭টি নমুনা পরীক্ষার সব কটিতে কোকেনের অস্তিত্ব শনাক্ত হয়।
সীমান্ত পথে ইয়াবা প্রবেশ
আইএনসিবি তাদের প্রতিবেদনে সীমান্ত পথে মাদক প্রবেশের বিষয়টিও তুলে ধরেছে। এতে বলা হয়েছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মাদক চক্রগুলো এখন আর স্থানীয় বাজারে সীমাবদ্ধ নেই। তারা দক্ষিণ এশিয়াকে নতুন বাজার হিসেবে লক্ষ্যবস্তু করেছে। বাংলাদেশে ইয়াবার বিস্তারও সেই বৃহত্তর নেটওয়ার্কের অংশ। মিয়ানমারের শান ও কাচিন রাজ্যে বিপুল পরিমাণ মেথামফেটামিন (ইয়াবা তৈরির উপাদান) উৎপাদিত হচ্ছে। এসব মাদক প্রথমে মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী অঞ্চল হয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পৌঁছায়। পরে ভারতের আসাম, মিজোরাম, মণিপুর, ত্রিপুরা ও মেঘালয়ের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা ব্যবহার করে বাংলাদেশে প্রবেশ করে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নাফ নদী, টেকনাফ, শাহপরীর দ্বীপ, উখিয়া, সেন্ট মার্টিন ও কক্সবাজার উপকূল দিয়ে মিয়ানমার থেকে দেশে মাদক ঢুকছে।
অপ্রচলিত মাদকের বিস্তার
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে প্রচলিত মাদকের পাশাপাশি অপ্রচলিত মাদকের দ্রুত বিস্তার ঘটছে। ২০১৮ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশে ১৩ ধরনের নতুন বা অপ্রচলিত মাদক শনাক্ত ও জব্দ করা হয়েছে। এ বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিচালক মেহেদী হাসান প্রথম আলোকে বলেন, “মূলত ২০১৮ সালের পর থেকে দেশে নতুন ধরনের মাদক শনাক্ত হওয়ার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এসব মাদকের বেশির ভাগই রাসায়নিকভাবে তৈরি।”
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ঝুঁকি
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, মাদক উৎপাদনকারী দেশ না হলেও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিশ্বের তিনটি প্রধান মাদক উৎপাদন ও পাচার অঞ্চল—গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল, গোল্ডেন ক্রিসেন্ট এবং গোল্ডেন ওয়েজের মধ্যবর্তী অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। ফলে আন্তর্জাতিক মাদক পাচারকারী চক্রের কাছে দেশটি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট রুট ও সম্ভাব্য বাজারে পরিণত হচ্ছে।
মিয়ানমার, লাওস ও থাইল্যান্ডের সীমানা মিলে গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল। এটি বাংলাদেশের পূর্বে অবস্থিত। মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি সীমানা রয়েছে। মাদক উৎপাদন ও চোরাচালানের পথ হিসেবে ইরান, আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানকে একত্রে বলা হয় গোল্ডেন ক্রিসেন্ট। এই অঞ্চল বাংলাদেশের পশ্চিমে। আর গোল্ডেন ওয়েজ হচ্ছে ভারতের হিমাচল প্রদেশ, উত্তর প্রদেশ, অরুণাচল প্রদেশ, নেপাল ও ভুটানের কিছু অংশ। এই অংশ বাংলাদেশের উত্তরে অবস্থিত।
সরকারের পদক্ষেপ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হাসান মারুফ প্রথম আলোকে বলেন, “যেসব দেশ থেকে মাদক আসছে, সেসব দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়, যাতে তারাও ব্যবস্থা নিতে পারে। একই সঙ্গে মাদক পাচারকারীদের আইনের আওতায় আনতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ দেশের বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে।” তিনি আরও বলেন, “সাইবার স্পেস (অনলাইন মাধ্যম) ব্যবহার করে মাদক পাচারের প্রবণতা বেড়ছে। এ ধরনের অপরাধ শনাক্ত ও প্রতিরোধে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি আইনগত ব্যবস্থা জোরদার করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।”
মাদকসংক্রান্ত অপরাধ মোকাবিলায় শক্তিশালী আইনি কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান বিএনপি সরকার। মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস আজ শুক্রবার (২৬ জুন) সরকারিভাবে পালন করা হচ্ছে। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য, ‘বিশ্বে মাদক সমস্যা: বিদ্যমান সংকট, নতুন চ্যালেঞ্জ এবং উদ্ভাবনী পদক্ষেপ’।



