তিবিলিসিতে অনুষ্ঠিত ২০২৬ জাতিসংঘ পাবলিক সার্ভিস ফোরামে (ইউএনপিএসএফ) ডিজিটাল গভর্নেন্স ও পাবলিক সার্ভিস উদ্ভাবনে বাংলাদেশ একাধিক আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব অর্জন করেছে। একইসঙ্গে নাগরিককেন্দ্রিক ডিজিটাল রূপান্তরে আরও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে দেশটি।
বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব ও দ্বিপাক্ষিক বৈঠক
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম ফোরামে ১২টি দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। তিনি পিয়ার লার্নিং ও দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতাকে স্থিতিস্থাপক ও নাগরিককেন্দ্রিক পাবলিক সার্ভিস ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেন। ফোরামের সাইডলাইনে তিনি ক্যাম্বোডিয়ার ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী ভান্দেথ চিয়া, আজারবাইজানের আসান ইনোভেশন সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক ভুসাল রুস্তমভ এবং কাজাখস্তানের আস্তানা সিভিল সার্ভিস হাবের চেয়ারম্যান আলিখান বাইমেনভের সঙ্গে পৃথক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন।
আজারবাইজান ও ক্যাম্বোডিয়ার সঙ্গে চুক্তি
বাংলাদেশ ও আজারবাইজান নাগরিককেন্দ্রিক সেবা প্রদানের লক্ষ্যে একটি কাঠামোবদ্ধ দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা কাঠামোতে সম্মত হয়েছে। এই অংশীদারিত্ব আজারবাইজানের আসান সার্ভিস মডেল ও বাংলাদেশের সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে একত্রিত করে পাবলিক সার্ভিস ডেলিভারি ও ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার (ডিপিআই) শক্তিশালী করবে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ও ক্যাম্বোডিয়া তৃণমূল পর্যায়ে ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ ও সরকারি কার্যক্রমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সংযোজনে একটি যৌথ কাঠামো উন্নয়নে সম্মত হয়েছে। এই সহযোগিতায় জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রযুক্তিগত বিনিময়, স্টাডি ভিজিট ও জ্ঞান বিনিময় অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
ইনোভেশন এজেন্সি প্রতিষ্ঠায় অগ্রগতি
ফোরামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলো আস্তানা সিভিল সার্ভিস হাবের সঙ্গে বাংলাদেশে একটি নতুন ইনোভেশন এজেন্সি প্রতিষ্ঠায় সহায়তার চুক্তি। সরকারের এটুআই প্রোগ্রামের সাফল্যের ভিত্তিতে প্রস্তাবিত এজেন্সিটি সরকারি খাতে উদ্ভাবন, গবেষণা ও নেতৃত্ব উন্নয়নে কাজ করবে। আস্তানা সিভিল সার্ভিস হাব প্রতিষ্ঠানটির নকশা প্রণয়ন ও সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য নেতৃত্ব প্রশিক্ষণ কর্মসূচি উন্নয়নে প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত সহায়তা দেবে।
মন্ত্রীর বক্তব্য: চ্যালেঞ্জ ও সমাধান
ফোরামের বিশেষ অধিবেশনে আনাম বলেন, বৈশ্বিক ডিজিটাল রূপান্তর উদ্যোগ এখনও বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, যেখানে ব্যর্থতার হার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ। তিনি বলেন, “এই ঝুঁকি কাটিয়ে উঠতে অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা বিনিময়ের কোনো বিকল্প নেই। পিয়ার-টু-পিয়ার ও দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা উন্নয়নের আনুষঙ্গিক বিষয় নয়, বরং উন্নয়নের মূল উপাদান। একটি দেশের সফল সমাধান অন্য দেশে উদ্ভাবন ও অগ্রগতি অনুপ্রাণিত করতে পারে।”
তিনটি স্তম্ভ: উদ্ভাবন, জবাবদিহিতা ও অন্তর্ভুক্তি
ফোরামের থিম “পাবলিক ইনস্টিটিউশন রূপান্তর: উদ্ভাবন, জবাবদিহিতা, অংশগ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তি অগ্রসর” উল্লেখ করে মন্ত্রী কার্যকর সরকারি খাত রূপান্তরের তিনটি স্তম্ভ চিহ্নিত করেন: উদ্ভাবন, জবাবদিহিতা ও অন্তর্ভুক্তি। তিনি বলেন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি পাবলিক সার্ভিস ডেলিভারি উন্নত করবে, শুধু নতুন টুলস চালু করবে না। স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক শাসন ব্যবস্থা জনগণের আস্থা অর্জনে অপরিহার্য। এআই-এর মতো উদীয়মান প্রযুক্তি যাতে ডিজিটাল বিভেদ কমায়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য গভীর না করে, সেদিকেও তিনি জোর দেন।
বাংলাদেশের অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
বাংলাদেশের অগ্রগতি তুলে ধরে আনাম বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারিক রহমান ও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের নেতৃত্বে দেশটি নাগরিককেন্দ্রিক ডিজিটাল রূপান্তর এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে। সেবা ডেলিভারি ম্যাচুরিটি মডেল ও প্রোডাক্ট ম্যানেজমেন্ট অ্যাপ্রোচ গ্রহণ করে সেবা ডেলিভারি ও বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা হচ্ছে। ইউএনডিপির সঙ্গে পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, নীতিনির্ধারণ ও রেগুলেটরি স্যান্ডবক্সে এআই-এর ব্যবহারিক প্রয়োগ নিয়ে কাজ করছে বাংলাদেশ। এআই সার্বভৌমত্ব, প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার, পক্ষপাত কমানো ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতির ওপরও জোর দেয়া হচ্ছে।
ভবিষ্যৎ প্রস্তুতি ও প্রতিশ্রুতি
তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ফোরামের আলোচনা ও চুক্তি বাংলাদেশকে এআই-চালিত শাসন ও ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচারের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ-প্রস্তুত পাবলিক ইনস্টিটিউশন গড়তে সহায়তা করবে। মন্ত্রী শেষে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর পারস্পরিক শিক্ষা, সহযোগিতা ও সম্মিলিত অগ্রগতির প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে আশা প্রকাশ করেন যে ফোরামটি বিশ্বব্যাপী আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, জবাবদিহিমূলক ও উদ্ভাবনী পাবলিক সার্ভিসে অবদান রাখবে।



