কিছুদিন আগেও রাজধানী ঢাকায় ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করা ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। সড়কে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ সদস্য হাতের ইশারায় যানবাহন থামতে বললেও তা অমান্য করে চলে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যেত। সড়ক ফাঁকা থাকুক বা না থাকুক, আগে যাওয়ার এক অন্ধ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতেন চালকরা।
তবে সম্প্রতি রাজধানীর বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিসম্পন্ন ক্যামেরা বসানোর ফলে সেই চিত্রে বড় পরিবর্তন এসেছে। সড়কের মোড়গুলোতে উন্নত ট্রাফিক সিগন্যাল ও এআই ক্যামেরা চালকদের মনস্তত্ত্বে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এখন সড়ক সম্পূর্ণ ফাঁকা পেয়েও সিগন্যাল দেখে গাড়ি থামিয়ে দিচ্ছেন চালকরা। সিগন্যালে লাল বাতি জ্বলার সঙ্গে সঙ্গেই স্টপ লাইনের পেছনে নিখুঁতভাবে থমকে যাচ্ছে সব যানবাহন।
চালকদের মধ্যে নতুন শৃঙ্খলা
বুধবার (২৭ মে) রাজধানীর শাহবাগের ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়, বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার ও বিজয় সরণিসহ বিভিন্ন এআই ক্যামেরা নিয়ন্ত্রিত সিগন্যাল ঘুরে চালকদের মধ্যে এই নতুন শৃঙ্খলা লক্ষ করা গেছে।
ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়ের চালকরা
ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়ে কথা হয় রতন নামের একজন প্রাইভেটকার চালকের সঙ্গে। তিনি বলেন, আগে ছিল ম্যানুয়াল পদ্ধতি, কাজ হতো হাতের ইশারায়। ট্রাফিক পুলিশ সিগন্যাল দিলেও অনেকে ফাঁক গলে চলে যেতো। কিন্তু এখন তো স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরা বসানো হয়েছে। এই ক্যামেরায় সব রেকর্ড হচ্ছে। সিগন্যাল অমান্য করলেই অটোমেটিক মামলা চলে আসবে। তাই যতই জরুরি কাজ থাকুক, এখন আর আইন ভাঙার সুযোগ নেই।
একই মোড়ে রাইড শেয়ারিং অ্যাপ 'পাঠাও'-এর চালক মোহাম্মদ সবুজ বলেন, আগে সিগন্যাল দিলেও ফাঁকফোকর দিয়ে চলে যাওয়া যেতো। এখন আর তা সম্ভব নয়। আইন ভাঙলেই ক্যামেরা রেকর্ড করে অটো মামলা দিয়ে দিচ্ছে। তাই রাস্তা যতই ফাঁকা থাকুক, সিগন্যাল আমাদের মানতেই হবে।
বাংলামোটর ও বিজয় সরণি
বাংলামোটর মোড়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালক গফুর মিয়া বলেন, আগের দিন এখন আর নাই। দেশ উন্নত হইছে, ট্রাফিক ব্যবস্থাও উন্নত হইছে। সিগন্যাল না মানলেই ঝামেলা। বিজয় সরণি ট্রাফিক সিগন্যালেও দেখা গেছে একই চিত্র। আগে যাওয়ার কোনও তাড়াহুড়ো নেই কারও মধ্যে; সিগন্যাল লাল হতেই নিয়ম মেনে সবাই থামিয়ে দিচ্ছেন গাড়ি।
ট্রাফিক পুলিশের বক্তব্য
ট্রাফিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সড়কে চলাচলরত যানবাহনের মালিক ও চালক— সবাই এখন সিগন্যাল মানছেন, যা অত্যন্ত ইতিবাচক একটি দিক। এর ফলে সড়কে দ্রুত শৃঙ্খলা ফিরে আসছে।
গত ৭ মে থেকে রাজধানীর ১০৫টি ট্রাফিক সিগন্যাল পয়েন্টে এআই প্রযুক্তিনির্ভর ক্যামেরা দিয়ে নজরদারি শুরু করেছে ট্রাফিক পুলিশ। এই ক্যামেরাগুলো ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের যেকোনো অপরাধ নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে পারে। পাশাপাশি স্থাপন করা হয়েছে দূর থেকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য উন্নত ‘প্যান-টিল্ট-জুম’ (পিটিজেড) ক্যামেরা, যা ডানে-বামে ও ওপরে-নিচে ঘুরিয়ে দূরের যানবাহনের নম্বর প্লেটও স্পষ্ট পড়তে পারে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বলেন, নতুন প্রযুক্তির প্রতি চালকদের ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। আসলে আইন প্রয়োগের সঠিক ব্যবস্থা থাকলে আমাদের দেশের মানুষ আইন মানতে চায়।
তিনি আরও জানান, রাজধানীতে বর্তমানে ১০৫টি এআই ক্যামেরা কার্যকর রয়েছে। আগামী ঈদুল আজহার পর আরও ১০০টি ক্যামেরা যুক্ত করা হবে, যা সড়কের শৃঙ্খলাকে আরও মজবুত করবে।
অটো মামলা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
স্বয়ংক্রিয় মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে এই কর্মকর্তা বলেন, এখন পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার অটো-মামলা দেওয়া হয়েছে এবং আরও প্রায় সাত হাজার ভিডিও ফুটেজ যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে।
তিনি বলেন, গত কয়েকদিন মূলত জনগণকে সচেতন করার জন্য আমরা ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করেছি এবং কিছু মামলা দিয়েছি। তবে ঈদের পর এই মনিটরিং ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হবে এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোরভাবে আইনগত ব্যবস্থা (মামলা) নেওয়া হবে।



