বাংলাদেশের ডিজিটাল অগ্রগতি দৈনন্দিন জীবনে সংযোগ এনে দিলেও সেবার গুণগত মান, ক্রয়ক্ষমতা ও ক্রমবর্ধমান সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকির মতো সমস্যা এখনও বিদ্যমান। বিশ্ব টেলিযোগাযোগ ও তথ্য সমাজ দিবস উপলক্ষে দেশের ডিজিটাল রূপান্তর 'স্মার্ট বাংলাদেশ' বাস্তবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ডিজিটাল সংযোগের বিস্তার ও চ্যালেঞ্জ
মোবাইল ব্যাংকিং, ই-কমার্স, অনলাইন শিক্ষা, ফ্রিল্যান্সিং ও সরকারি সেবা—সব ক্ষেত্রেই ডিজিটাল সংযোগ মানুষের পড়াশোনা, কাজ ও লেনদেনের পদ্ধতি বদলে দিয়েছে। তবে নেটওয়ার্কের নির্ভরযোগ্যতা, অসম প্রবেশাধিকার, খরচ ও সাইবার হুমকি এই সম্প্রসারণকে ছায়া ফেলছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখন প্রায় ১৯ কোটি মোবাইল গ্রাহক ও ১৩ কোটির বেশি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী রয়েছে, যা টেলিকমকে দ্রুত বর্ধনশীল খাতগুলোর একটি করে তুলেছে।
গ্রাহকদের অভিজ্ঞতা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তানভির হাসান বলেন, “অনলাইন ক্লাস, ভিডিও কনফারেন্স ও গবেষণার কাজ প্রায়ই অস্থির ইন্টারনেট সংযোগের কারণে কঠিন হয়ে পড়ে। মোবাইল ডেটার দাম বাড়লেও সেবার মান ততটা উন্নত হয় না।” গ্রামীণ এলাকায় এই বৈষম্য আরও প্রকট। ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের ছোট উদ্যোক্তা রাবেয়া খাতুন বলেন, “আমি অনলাইনে পণ্য বিক্রি করি এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে পেমেন্ট নেই। কিন্তু নেটওয়ার্ক ব্যর্থ হলে লেনদেন বন্ধ হয়ে যায়। শহরের মানুষের মতো সেবা আমরা এখনও পাই না।”
শিল্প বিশ্লেষকদের মতামত
শিল্প বিশ্লেষকরা বলছেন, টেলিকম অবকাঠামো উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হলেও সেবার মান বজায় রাখা খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ৪জি প্রযুক্তি প্রবেশাধিকার বাড়িয়েছে, কিন্তু গতি ও ধারাবাহিকতা অসম রয়ে গেছে।
সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা ব্যবহারকারীদের ফিশিং স্ক্যাম, আর্থিক জালিয়াতি, পরিচয় চুরি ও সামাজিক মাধ্যম অ্যাকাউন্ট হ্যাকিংয়ের মতো সাইবার ঝুঁকির মুখে ফেলছে। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আরিফ মহিউদ্দিন বলেন, “বাংলাদেশে ডিজিটাল গ্রহণ দ্রুত বাড়ছে, কিন্তু সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে জনসচেতনতা একই গতিতে বাড়ছে না। অনেক ব্যবহারকারী অজান্তে সন্দেহজনক লিঙ্কে ক্লিক করেন, অযাচাই করা অ্যাপ ইনস্টল করেন বা ঝুঁকি না বুঝে ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করেন। এটি আর্থিক জালিয়াতি ও ডেটা চুরির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, “স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে শুধু ইন্টারনেট প্রবেশাধিকার বা নতুন প্রযুক্তি চালু করাই যথেষ্ট নয়; এর জন্য শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা অবকাঠামো, ডিজিটাল সাক্ষরতা ও সাধারণ ব্যবহারকারীদের মধ্যে সচেতনতা প্রয়োজন। টেকসই ডিজিটাল অগ্রগতি নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে।”
ক্রয়ক্ষমতা ও ৫জি চ্যালেঞ্জ
ক্রয়ক্ষমতাও একটি উদ্বেগের বিষয়। টেলিকম স্টেকহোল্ডাররা বলছেন, মোবাইল ডেটার ওপর একাধিক স্তরের কর ইন্টারনেটের দাম বেশি রাখছে, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের ব্যবহারকারীদের জন্য। বাংলাদেশ সীমিত পরিসরে ৫জি চালু করলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবকাঠামোগত ঘাটতি, উচ্চ বিনিয়োগ ব্যয় ও বাজার প্রস্তুতির চ্যালেঞ্জের কারণে দেশব্যাপী গ্রহণ এখনও দূরের কথা।
জনগণের আস্থা
ঢাকার বেসরকারি খাতের কর্মচারী সুমাইয়া রহমান বলেন, “ব্যাংকিং থেকে কেনাকাটা—সবকিছু এখন অনলাইনে। কিন্তু অনলাইন জালিয়াতি ও ডেটা ফাঁসের গল্প মানুষকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। প্রযুক্তির সঙ্গে শক্তিশালী সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকতে হবে।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থনৈতিক কার্যক্রম, শিক্ষা ও যোগাযোগের জন্য ইন্টারনেট অ্যাক্সেস অপরিহার্য অবকাঠামো হয়ে উঠেছে। তবে তারা সতর্ক করে বলেন, গ্রাম-শহরের বৈষম্য দূর করা, সেবার মান উন্নত করা ও সাইবার স্থিতিস্থাপকতা শক্তিশালী করা অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল প্রবৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ তার ডিজিটাল রূপান্তর অব্যাহত রাখায় এই বছরের ডব্লিউটিআইএসডি শুধু অগ্রগতিই নয়, বরং কাঠামোগত ঘাটতিগুলোও তুলে ধরেছে।



