'রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কার' শীর্ষক এক আলোচনা সভায় বক্তব্য দিয়েছেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, 'পুরোনো পথে হাঁটলে সেই পুরোনো গন্তব্যেই যাওয়া যায়। পুরোনো গন্তব্যই গন্তব্যস্থল হয়। আমাদের তাই হচ্ছে। সবারই সর্বতোভাবে প্রচেষ্টা চালানো উচিত, যাতে আমরা সেই পুরোনো গন্তব্যে না পৌঁছায়। কারণ, এটা কল্যাণ বয়ে আনবে না।'
গণভোট ও সংসদের সার্বভৌমত্ব
গণভোটের প্রসঙ্গ টেনে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, জনগণ হলো সার্বভৌম, সংসদ সার্বভৌম নয়। তাই তারা যা ইচ্ছা তা করতে পারে না। তাই সার্বভৌম জনগণ যখন রায় দিয়েছে, সেটা অবশ্যই পালনীয়।
এমপিদের স্থানীয় সরকারে ভূমিকা
জাতীয় সংসদের সদস্যদের (এমপি) নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় উপজেলা পরিষদে 'বসার জায়গা' করে দেওয়ার প্রসঙ্গ নিয়েও আলোচনা করেন বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, এমপি যদি বসেন, তাহলে কার ঘাড়ে কয়টা মাথা আছে, তাঁর বিরুদ্ধে কথা বলার। তার মানে এমপিরা স্থানীয় সরকার পরিচালনা করবেন। এটি সংবিধানের দুটি অনুচ্ছেদের পরিপন্থী।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, যদি স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো দ্রুত না করা হয়, যদি প্রশাসক দিয়ে পরিচালনা করা হয়, তাহলে সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন হবে। শুধু তা–ই নয়, ৫৯ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করা হবে। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে চালাতে হবে। তিনি বলেন, নির্বাচন নিয়ে গড়িমসি, প্রশাসক নিয়োগ করা—বিএনপির ৩১ দফার পরিপন্থী, তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গেও সংগতিপূর্ণ নয়।
সংসদের সফলতা ও সংস্কার
সুজনের সম্পাদক বলেন, 'আমরা চাই বর্তমান সংসদ সফল হোক। বর্তমান সংসদ আমাদের যে আকাঙ্ক্ষা একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ সৃষ্টি করার এবং কতগুলো সংস্কার, যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে জনগণ রাস্তায় নেমেছিল, প্রাণ দিয়েছিল, বস্তুত আমরা রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছি, সেগুলো বাস্তবায়ন করুক।'
আইন প্রণয়নের জরুরি প্রয়োজন
দুটি আইন প্রণয়ন জরুরি উল্লেখ করে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, অতীতে যাঁরাই সংসদ সদস্য হয়েছেন, তাঁরাই বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন। এটাই অর্থবিত্তের মালিক হওয়ার সবচেয়ে মোক্ষম উপায়। এ জন্য সংসদ সদস্য আচরণবিধি আইন করা দরকার; যার মাধ্যমে সংসদ সদস্যরা যাতে তাঁদের স্বার্থের দ্বন্দ্ব সেটা ঘোষণা করেন এবং প্রতিবছর নিজেদের সম্পদের হিসাব দেন। পাশাপাশি সংসদ ও সংসদ সদস্যদের বিশেষ অধিকার আইন প্রণয়ন জরুরি।
পুলিশ বাহিনীর সংস্কার
আলোচনা সভায় অংশ নিয়ে লেখক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ বলেন, ঊনবিংশ শতাব্দীতে একটা দারোগাব্যবস্থা ছিল, আজকের দারোগাব্যবস্থা কিন্তু সে রকমই আছে। গত দুই বছরে পুলিশের পোশাক দুবার পরিবর্তন হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বলা হচ্ছে এটা সংস্কার হয়েছে। পুলিশ বাহিনী নিয়ে জনগণের সংকটটা কী জামাকাপড়ের নাকি জনগণের হয়রানির অভিজ্ঞতা? মানুষ চায় সমস্যার মৌলিক পরিবর্তন।
দুদক ও মানবাধিকার কমিশন
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অধ্যাদেশ কার্যকর হয়নি, গুমসংক্রান্ত ও মানবাধিকার কমিশনের ক্ষমতা বাড়িয়ে যে অধ্যাদেশ করা হয়েছিল, তা আলোর মুখ দেখেনি উল্লেখ করে আলতাফ পারভেজ বলেন, 'তার মানে কাঠামোগত সংস্কারের ক্ষেত্রে যতটুকু আইনি অগ্রগতি হয়েছিল, তা থেকে আমরা আবার পিছু হটে গেছি।'
জাতীয় সংস্কার চার্টার
কাঠামোগত সংস্কারের বিষয়গুলো নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে সিরিজ আলোচনা হওয়া দরকার উল্লেখ করে এই গবেষক বলেন, '৮০০ শহীদের প্রতি বা মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে নব্বই থেকে নিয়ে যত ধরনের আন্দোলন–সংগ্রাম হয়েছে, মানুষ প্রাণ দিয়েছে, আহত হয়েছে—তাদের প্রতি আমাদের যদি কোনো দায়বদ্ধতা থাকে, তাহলে সংস্কারের একটা ন্যাশনাল চার্টার করে একটা ন্যাশনাল ফ্রন্ট তৈরি করে এগোতে হবে।'
বিএনপি ও জামায়াতের প্রতি আশা
বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর ভালো ও সমৃদ্ধি চেয়ে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, তারা সুবুদ্ধির পরিচয় দেবে, সংসদকে ঠিকভাবে পরিচালনা করবে—এমনটাই আশা করেন।
কাঠামোগত সংস্কারের মূল কথা
সভাপতির বক্তব্যে মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, কাঠামোগত সংস্কার তখনই হবে, যখন আমরা কাঠামো বুঝব, কাঠামোকে স্পর্শ করতে পারব, তার ভুলটা ধরতে পারব এবং ভুল সংশোধন করার যথাযথ পরিস্থিতি বুঝতে পারব।



