ঢাকা মহানগরের সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রযুক্তিনির্ভর কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও ব্যস্ত সড়কে বসানো হয়েছে অত্যাধুনিক এআই ক্যামেরা। এসব ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করছে লাল বাতি অমান্য, স্টপ লাইন ভঙ্গ, উল্টো পথে চলাচল, জেব্রা ক্রসিং দখল, হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো, সিটবেল্ট না পরা, অবৈধ পার্কিং এবং অনুমতি ছাড়া ভিআইপি লাইট ব্যবহারের মতো নানা ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন।
প্রযুক্তির এই নজরদারিতে ইতোমধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে রাজধানীর সড়কে। ধীরে ধীরে ফিরছে যানবাহনের শৃঙ্খলা। আইন মানতে বাধ্য হচ্ছেন চালকেরা। আগে যেখানে ট্রাফিক সার্জেন্টেরা উপস্থিতিতেও অনেক চালক নির্দেশ অমান্য করতেন, সেখানে এআই ক্যামেরার নজরদারিতে অমান্য করার সাহস পাচ্ছেন না চালকেরা।
ট্রাফিক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এক সময় হাতের ইশারায় গাড়ি থামাতে হিমশিম খেতে হতো তাদের। এখন প্রযুক্তিই স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইনভঙ্গ শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিচ্ছে, যা রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় নতুন বাস্তবতার আশা দেখাচ্ছে। আইন অমান্যকারীরা মামলা এড়াতে সুপারিশ বা প্রভাব খাটানোর সুযোগ পাচ্ছেন না। এতে একদিকে যেমন জবাবদিহি বেড়েছে, অন্যদিকে স্বস্তি ফিরে এসেছে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের মধ্যেও।
সড়কে দৃশ্যমান পরিবর্তন
শনিবার (১৬ মে) দুপুরে রাজধানীর কয়েকটি সড়ক ঘুরে দেখা গেছে, যেসব স্থানে এআই প্রযুক্তিনির্ভর ক্যামেরা বসানো হয়েছে, সেসব মোড়ে ট্রাফিক আচরণে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। সিগন্যাল লাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অধিকাংশ যানবাহন থেমে যাচ্ছে। যদিও কোথাও কোথাও কয়েকটি গাড়িকে স্টপ লাইন অতিক্রম করতে দেখা গেছে।
রাজধানীর বিজয় সরণি মোড়ে দেখা যায়, সিগন্যালের লাল বাতি জ্বলে উঠতেই সারিবদ্ধভাবে থেমে যায় যানবাহন। কোনও গাড়িকে জেব্রা ক্রসিং দখল করেনি। সবুজ বাতির অপেক্ষায় নির্দিষ্ট লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল যানবাহন।
চালকদের মতামত
বিজয় সরণি সিগন্যালে কথা হয় প্রাইভেটকার চালক রতনের সঙ্গে। তিনি বলেন, “এটা খুবই ভালো উদ্যোগ। সড়কে শৃঙ্খলা ফিরতে শুরু করেছে। আগে সিগন্যাল দিলেও অনেক সময় দ্রুত চলে যাওয়ার চেষ্টা করতাম কিংবা জেব্রা ক্রসিং পার হয়ে দাঁড়াতাম। এখন অটো মামলার ভয়ে সেটা করছি না। গাড়ির মালিকের পক্ষ থেকেও আইন মেনে চলার কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”
একই সিগন্যালে অপেক্ষা করতে দেখা যায় মোটরসাইকেল চালক রফিককে। তার পেছনে ছিলেন এক যাত্রী। রফিক জানান, তিনি রাইড শেয়ারিং করেন। বাংলামোটর থেকে কুড়িল ৩০০ ফিট এলাকায় যাত্রী নিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। রফিক বলেন, “এটা ট্রাফিক পুলিশের ভালো উদ্যোগ। এখন কেউ সহজে আইন ভাঙছে না। ভালো লাগছে, আবার ভয়ও কাজ করছে। আগে দ্রুত যাওয়ার জন্য প্রায়ই জেব্রা ক্রসিং পার হয়ে সামনে দাঁড়াতাম। এখন ভুল করলে সঙ্গে সঙ্গে মামলা হবে।”
রাজধানীর শাহবাগ মোড়েও দেখা গেছে প্রায় একই চিত্র। সিগন্যাল লাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চলমান যানবাহন থেমে যাচ্ছে নির্ধারিত লাইনে। তবে, দুই একটি মোটরসাইকেলকে স্টপ লাইন কিংবা জেব্রা ক্রসিং অতিক্রম করতে দেখা গেছে। এমনই একজন মোটরসাইকেল চালক মাহমুদ। তিনি বলেন, “হঠাৎ করেই সিগন্যাল পড়ে যায়, খেয়াল করতে পারিনি। এ জন্য জেব্রা ক্রসিং অতিক্রম করে দাঁড়িয়ে গেছি।” একই মোড়ে অপেক্ষমান সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালক রাকিব বলেন, “শুনেছি ক্যামেরা দিয়ে মামলা হচ্ছে। তাই এখন নিয়ম মেনেই দাঁড়াই, আইন মানছি।”
এআই ক্যামেরার কার্যকারিতা
ট্রাফিক কর্মকর্তারা বলছেন, যান চলাচলের দিক থেকে দীর্ঘদিন ধরে চরম বিশৃঙ্খল এই মহানগরে শৃঙ্খলা ফেরাতে অতীতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসেনি। চালকদের নিয়মের মধ্যে আনতে এবং সড়কে স্থায়ী শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই উন্নত প্রযুক্তির এআই ক্যামেরা চালু করা হয়েছে। তাদের দাবি, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির কারণে চালকদের আচরণে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। আগে সিগন্যাল অমান্য করে আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতা থাকলেও এখন অনেকেই সতর্ক হচ্ছেন। ফলে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরতে শুরু করেছে এবং মাঠপর্যায়ে ট্রাফিক পুলিশের ওপর চাপও কমেছে।
ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগ জানিয়েছে, গত ৭ মে থেকে রাজধানীর সড়কে এআই প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি কার্যক্রম শুরু হয়েছে। গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত ট্রাফিক আইন অমান্যের পাঁচ হাজারের বেশি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে তিন হাজারের বেশি ফুটেজ পর্যালোচনা করা হয়েছে। বর্তমানে ট্রাফিক পুলিশের টেকনিক্যাল টিম (টিটিইউ) সেগুলো যাচাই-বাছাই করছে। যাচাই শেষে আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট গাড়ির মালিক ও চালকদের কাছে মামলা এবং নোটিশ পাঠানো হবে।
ক্যামেরা স্থাপনের স্থান
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, রাজধানীর অন্তত ১০৫টি ট্রাফিক সিগন্যাল পয়েন্টে এআই প্রযুক্তি চালু করা হয়েছে। এসব ক্যামেরা ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের বিভিন্ন অপরাধ শনাক্ত করছে। এসব পয়েন্টে প্যান-টিল্ট-জুম (পিটিজেড) প্রযুক্তির উন্নত ক্যামেরাও স্থাপন করা হয়েছে। দূর থেকে নিয়ন্ত্রিত এই ক্যামেরা ডানে-বামে ও ওপরে-নিচে ঘোরানো যায় এবং জুম করে দূরের যানবাহনের নম্বর প্লেট পর্যন্ত শনাক্ত করতে সক্ষম।
ট্রাফিক বিভাগ জানায়, গুলশান-১ ও ২, উত্তরা, বিমানবন্দর সড়ক, রামপুরা ট্রাফিক বক্স, মহাখালী, শাহবাগ, হাইকোর্ট ক্রসিং, সচিবালয় সিগন্যাল, কদম ফোয়ারা, মৎস্য ভবন, কাকরাইল মসজিদ ক্রসিং, পুলিশ ভবন, পুরাতন রমনা থানা ক্রসিং, বাংলামোটর, বিজয় সরণি, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, মিরপুর রোডের ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন এলাকা, গাবতলী ও শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ সরণিসহ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলো এআই ক্যামেরা বসানো হয়েছে।
বিজয় সরণি মোড়ে দায়িত্ব পালনরত ট্রাফিক সার্জেন্ট আলমাস বলেন, “এআই ক্যামেরা চালুর পর ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। আগে অনেক ক্ষেত্রে ট্রাফিক সদস্যদের সরাসরি উপস্থিত থেকে যানবাহন থামিয়ে ব্যবস্থা নিতে হতো। এতে সময় বেশি লাগার পাশাপাশি সড়কে যানজট তৈরি হতো। এখন ক্যামেরার মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য সংগ্রহ হওয়ায় কাজের চাপ কমেছে এবং প্রমাণভিত্তিক মামলা দেওয়া সহজ হয়েছে। ফলে আইন ভাঙার প্রবণতাও কমছে এবং চালকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ছে।”



