প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে নারীদের অনলাইন উপস্থিতি যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতা, সাইবার হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল, ডিপফেক, সাইবারস্টকিং এবং সমন্বিত অনলাইন আক্রমণের ঘটনা। সাম্প্রতিক গবেষণা, পুলিশের তথ্য এবং ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা বলছে, বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নারীদের জন্য ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে উঠছে।
গবেষণার তথ্য
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও জাতিসংঘের জনসংখ্যা ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ক সংস্থা ইউএনএফপিএর ‘ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন সার্ভে ২০২৪’ অনুযায়ী, দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী প্রায় ৮৯ শতাংশ নারী জীবনের কোনও না কোনও সময়ে অনলাইন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। গবেষণাটি বলছে, বাংলাদেশের প্রতি চারজন নারীর মধ্যে প্রায় তিনজন জীবনের কোনও না কোনও সময়ে সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছেন এবং প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতা এখন বড় ঝুঁকি হয়ে উঠছে।
পুলিশের ভূমিকা
পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন ইউনিটের কর্মকর্তা আবদুল্লাহ শরীফ আহমেদ বলেন, ‘অনলাইন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল এবং সম্পাদিত বা বিকৃত ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ আমরা প্রতিদিন পাই। প্রথমে আমরা ডিজিটাল প্রমাণ যাচাই করি। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মে কনটেন্ট সরানোর অনুরোধ এবং ভুয়া অ্যাকাউন্ট ব্লকের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অভিযুক্ত শনাক্ত হলে আইনি ব্যবস্থা ও গ্রেফতার করা হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘তদন্ত প্রক্রিয়ায় কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাব, ভুক্তভোগীর দেরিতে অভিযোগ করা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় ঘাটতির কারণে অনেক মামলার নিষ্পত্তি দ্রুত করা যায় না।’
সহায়তা হটলাইন
বাংলাদেশ পুলিশ জানিয়েছে, নারীদের সহায়তায় ২৪ ঘণ্টার বিশেষ সাইবার হেল্পলাইন চালু রয়েছে। হটলাইন নম্বরগুলো হলো ০১৩২০-০০২০০১, ০১৩২০-০০২০০২ এবং ০১৩২০-০০২২২২। এছাড়া ‘পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন’ ইউনিট তাদের ফেসবুক পেজ ও হটলাইন নম্বরের (০১৩২০০০০৮৮৮) মাধ্যমে অভিযোগ গ্রহণ করছে।
আইনি সহায়তা
বাংলাদেশে অনলাইন হয়রানি, ডিপফেক, ছবি ফাঁস, ব্ল্যাকমেইল, ভুয়া পরিচয়, সাইবারস্টকিং এবং যৌন হয়রানি মোকাবিলায় কয়েকটি আইন রয়েছে। এসব আইনে কারাদণ্ড, জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩
বাংলাদেশে ডিজিটাল অপরাধ মোকাবিলার প্রধান আইন হলো সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩। এই আইনে বিভিন্ন ধরনের অনলাইন অপরাধকে শাস্তিযোগ্য করা হয়েছে। কারও ছবি বা তথ্য ব্যবহার করে ভুয়া পরিচয় বা অ্যাকাউন্ট তৈরি করলে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড, জরিমানা বা উভয় দণ্ড হতে পারে। অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও বা তথ্য প্রকাশ বা ছড়িয়ে দিলে দুই থেকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রয়েছে। অনলাইন হুমকি, সাইবার বুলিং, যৌন হয়রানি এবং ব্ল্যাকমেইলও এই আইনের আওতায় দণ্ডনীয়। হ্যাকিং, তথ্য চুরি বা ডিজিটাল প্রতারণার ক্ষেত্রে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী তিন থেকে সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২
এই আইনের আওতায় অনুমতি ছাড়া অশ্লীল ছবি বা ভিডিও তৈরি, সংরক্ষণ, প্রকাশ বা বিতরণ দণ্ডনীয় অপরাধ। প্রথম অপরাধে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রয়েছে। পুনরাবৃত্তির ক্ষেত্রে সাজা ১০ বছর পর্যন্ত হতে পারে। ডিপফেক, রিভেঞ্জ পর্ন বা ব্যক্তিগত ভিডিও ফাঁসের ঘটনাও এই আইনের আওতায় পড়তে পারে।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন
অনলাইনে ধর্ষণের হুমকি, যৌন হয়রানি বা গুরুতর মানসিক নির্যাতনের কিছু ঘটনা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় বিচারযোগ্য হতে পারে। অপরাধের ধরন অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
দণ্ডবিধি, ১৮৬০
মানহানি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, অশ্লীলতা, যৌন হয়রানি এবং ব্ল্যাকমেইলসহ বিভিন্ন অনলাইন অপরাধ মোকাবিলায় দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারা ব্যবহার করা হয়। অপরাধ অনুযায়ী জরিমানা থেকে শুরু করে কয়েক মাস বা কয়েক বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।
সাইবার ট্রাইব্যুনাল
বাংলাদেশে ডিজিটাল অপরাধের বিচার পরিচালনার জন্য বিশেষ সাইবার ট্রাইব্যুনাল রয়েছে। এসব ট্রাইব্যুনালে অনলাইন হয়রানি, ছবি ফাঁস, হ্যাকিং, ব্ল্যাকমেইল এবং প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতার মামলার বিচার হয়।



