হুয়াওয়ের বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন: নতুন যুগের সূচনা
হুয়াওয়ের বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন: নতুন যুগের সূচনা

দীর্ঘ বিরতির পর হুয়াওয়ে বাংলাদেশের ভোক্তা ডিভাইস বাজারে আনুষ্ঠানিকভাবে ফিরে এসেছে। ২০২৬ সালের জুন মাসে 'নাও ইজ ইওর স্পার্ক' থিমে এক জমকালো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা দেয় বৈশ্বিক প্রযুক্তি জায়ান্টটি। এর মাধ্যমে তারা বাংলাদেশের স্মার্টফোন বাজারে নতুন করে প্রতিযোগিতায় নামার ইঙ্গিত দিয়েছে।

হুয়াওয়ের পতন ও পুনরুত্থান

হুয়াওয়ের স্মার্টফোন ব্যবসা মূলত ২০১৯ সালে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে। তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হুয়াওয়েকে 'এন্টিটি লিস্ট'-এ যুক্ত করে, যার ফলে আমেরিকান কোম্পানিগুলো হুয়াওয়ের সাথে ব্যবসা করতে পারেনি। সবচেয়ে বড় ধাক্কা ছিল গুগল মোবাইল সার্ভিসেস (জিএমএস) হারানো। হঠাৎ করেই হুয়াওয়ের নতুন ডিভাইসগুলো গুগল প্লে স্টোর, ইউটিউব, জিমেইল ও গুগল ম্যাপের মতো জনপ্রিয় অ্যাপ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

একই সময়ে কানাডায় হুয়াওয়ের সিএফও গ্রেপ্তারের ঘটনা চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা মিত্রদের মধ্যে কূটনৈতিক জটিলতা তৈরি করে। সরবরাহ চেইন ব্যাহত হওয়া, নিজস্ব কিরিন চিপের ঘাটতি এবং ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় বাজার হারানোর ফলে হুয়াওয়ের স্মার্টফোন ব্যবসা সংকুচিত হয়ে পড়ে। বাংলাদেশেও ২০২১ সালের শেষ নাগাদ হুয়াওয়ের ভোক্তা ডিভাইসের উপস্থিতি প্রায় শূন্যে নেমে আসে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অবকাঠামোতে অবিচ্ছিন্ন উপস্থিতি

ভোক্তা বাজার থেকে হুয়াওয়ে অন্তর্ধান হলেও বাংলাদেশে কোম্পানিটির উপস্থিতি কখনোই শেষ হয়নি। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে হুয়াওয়ে বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোর মূল স্থপতি হিসেবে কাজ করছে। ভোক্তা ডিভাইস ব্যবসা বন্ধ থাকাকালীন সময়েও এন্টারপ্রাইজ ও ক্যারিয়ার নেটওয়ার্ক বিভাগ পূর্ণ গতিতে কাজ করে গেছে। বর্তমানে হুয়াওয়ে বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোর একটি বড় অংশ পরিচালনা করছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গ্রামীণ এলাকায় নেটওয়ার্ক কেবল স্থাপন থেকে শুরু করে টেলিটকের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রথম ৫জি নেটওয়ার্ক পরীক্ষা বাণিজ্যিকভাবে চালু করায় হুয়াওয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এছাড়া ক্লাউড কম্পিউটিং, ডেটা সেন্টার, ডিজিটাল পাওয়ার সলিউশন এবং কর্পোরেট আইসিটি প্রতিভা উন্নয়নেও তারা কাজ করেছে। এই বিবিটু-বি উপস্থিতি ব্র্যান্ডের সুনাম ও প্রতিষ্ঠানের সদিচ্ছা অক্ষুণ্ন রেখেছে, যা ২০২৬ সালের ভোক্তা বাজারে প্রত্যাবর্তনের শক্ত ভিত তৈরি করেছে।

নতুন পণ্য পোর্টফোলিও

হুয়াওয়ে স্থানীয় খুচরা সমষ্টি ডিএক্স গ্রুপকে জাতীয় পরিবেশক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে বাজারে ফিরেছে। তারা মোট ১৩টি উদ্ভাবনী পণ্য নিয়ে এসেছে, যা প্রিমিয়াম ও উচ্চ-মধ্যম সেগমেন্টকে লক্ষ্য করে তৈরি। প্রধান আকর্ষণ হলো হুয়াওয়ে মেট এক্স৭, একটি অতি-প্রিমিয়াম ফোল্ডেবল স্মার্টফোন। এছাড়া ফ্ল্যাগশিপ হুয়াওয়ে মেট ৮০ প্রোতে রয়েছে অত্যাধুনিক মোবাইল ফটোগ্রাফি অ্যালগরিদম ও শক্তিশালী প্রসেসর। তরুণ প্রজন্মের জন্য হুয়াওয়ে নোভা ১৫ ম্যাক্স আনা হয়েছে, যাতে রয়েছে আকর্ষণীয় ডিজাইন ও উন্নত সেলফি সক্ষমতা।

গুগলের অনুপস্থিতি মোকাবিলা

হুয়াওয়ের নতুন ডিভাইসে গুগল মোবাইল সার্ভিসেস না থাকলেও তারা হুয়াওয়ে মোবাইল সার্ভিসেস (এইচএমএস) ও অ্যাপগ্যালারি ইকোসিস্টেমকে আরও পরিণত করেছে। নতুন ডিভাইসগুলোতে হোয়াটসঅ্যাপ, সামাজিক মাধ্যম, ব্যাংকিং অ্যাপ ও স্থানীয় ডিজিটাল সেবা নেটিভভাবে ব্যবহার করা যায়। অনুপস্থিত অ্যাপের জন্য বিকল্প সুরক্ষিত রিপোজিটরি যুক্ত করা হয়েছে, যা প্রচলিত অ্যান্ড্রয়েড ফ্রেমওয়ার্কের ওপর নির্ভর না করেই ব্যবহার করা যায়।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

হুয়াওয়ের প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের দ্রুত বর্ধনশীল ডিজিটাল অর্থনীতিতে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করবে। কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, তারা দেশীয় উৎপাদন নীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে স্থানীয় অ্যাসেম্বলি প্ল্যান্ট স্থাপনের সম্ভাবনা মূল্যায়ন করছে। অফিসিয়াল ওয়ারেন্টি, ডেডিকেটেড সার্ভিস সেন্টার ও পরিধানযোগ্য ডিভাইস এবং ট্যাবলেটের সমন্বিত স্মার্ট ইকোসিস্টেম নিয়ে হুয়াওয়ে বাজারে নিজের অবস্থান ফিরে পেতে চায়। বাংলাদেশি ভোক্তাদের জন্য এই প্রত্যাবর্তনের অর্থ আরও পছন্দ, আরও ভালো উদ্ভাবন ও আরও প্রতিযোগিতামূলক প্রযুক্তি বাজার।