বাংলা ভাষায় আরবি শব্দের ব্যবহার: বিবর্তন নাকি আগ্রাসন? বিতর্কে অধ্যাপক মনজুরের সতর্কতা
বাংলা ভাষায় আরবি শব্দের ব্যবহার: বিবর্তন নাকি আগ্রাসন?

বাংলা ভাষায় আরবি শব্দের ব্যবহার নিয়ে তীব্র বিতর্ক

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে বাংলা ভাষায় আরবি শব্দের ব্যবহার নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ও সংবাদমাধ্যমে আলোচনা চলছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. তারিক মনজুর এবং সাংবাদিক শাকিলা জেরিনের লেখায় 'ইনসাফ', 'ফয়সালা', 'জুলুম' ইত্যাদি শব্দের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

অধ্যাপক মনজুরের ভাষা বিকৃতির আশঙ্কা

প্রথম আলোর ফেসবুক পেইজে প্রকাশিত ভিডিও সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক তারিক মনজুর বাংলা ভাষায় আরবি শব্দের ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, 'ইনসাফ, ইনকিলাব, ফয়সালা- এসব শব্দ বাংলা ভাষায় টিকবে না।' তিনি এসব শব্দের ব্যবহারকে 'আরোপণ' হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যার অর্থ শব্দগুলো স্বতস্ফূর্তভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে না।

অধ্যাপক মনজুর তার বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন:

  • পাকিস্তান পর্বে ইস্ট বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ কমিটি আরবি-ফারসি শব্দ আরোপের চেষ্টা করেছিল।
  • এই আরোপণ ভাষার বিকৃতি ঘটায় না, বরং এটি একটি রাজনৈতিক ব্যাপার।
  • এসব শব্দের মাধ্যমে জাতিগত বিভাজনের প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে।

বিডিনিউজের নিবন্ধে শাকিলা জেরিনের বিশ্লেষণ

বিডিনিউজের প্রকাশিত নিবন্ধে সাংবাদিক শাকিলা জেরিন লিখেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে রাজনীতি, সংবাদ ও দৈনন্দিন কথোপকথনে আরবি, উর্দু ও ফারসি শব্দের ব্যবহার বেড়েছে। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, 'এ কি স্বাভাবিক বিবর্তন, নাকি আদর্শিক আগ্রাসন?'

শাকিলা জেরিনের মতে:

  1. 'ইনসাফ' শব্দের পরিবর্তে 'ন্যায়বিচার' ব্যবহার করা উচিত।
  2. 'ফয়সালা'র বাংলা 'মীমাংসা' বা 'রায়' হওয়া উচিত।
  3. শব্দের ব্যবহার ক্ষমতার ভাষা প্রকাশ করে এবং ধারণা রাজনীতি তৈরি করে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: শব্দগুলোর দীর্ঘদিনের ব্যবহার

যদিও বিডিনিউজের নিবন্ধে দাবি করা হয়েছে যে এসব শব্দ 'হঠাৎ বেড়েছে', বাস্তবে 'ইনসাফ', 'জুলুম', 'ফয়সালা' শব্দগুলো বাংলা ভাষায় বহু দশক ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী' ও 'কারাগারের রোজনামচা' বইয়ে এই শব্দগুলোর ব্যাপক ব্যবহার পাওয়া যায়:

  • 'কারাগারের রোজনামচা'তে 'জুলুম' ১৮ বার, 'ইনসাফ' ২ বার, 'ফয়সালা' ৪ বার ব্যবহৃত হয়েছে।
  • 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী'তে 'জুলুম' ৭ বার, 'ইনসাফ' ২ বার ব্যবহৃত হয়েছে।

এই বইগুলো ১৯৬৬-১৯৬৯ সালের মধ্যে লেখা, যা প্রমাণ করে সাত দশক আগেও এসব শব্দের ব্যবহার ছিল।

রাজনৈতিক দলগুলোর শব্দ ব্যবহারের চিত্র

'ইনসাফ', 'জুলুম', 'ফয়সালা', 'ইনকিলাব' শব্দগুলো দল-মত নির্বিশেষে সব পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং বহুল ব্যবহৃত।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ: দলের অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজে এসব শব্দের ব্যবহার দেখা গেছে। ২০২৫ সালের জুন মাসের একটি পোস্টারে লেখা ছিল, '১৬ জুন থেকে রাজপথেই হবে চূড়ান্ত ফয়সালা।' প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যেও 'জুলুম' শব্দের ব্যবহার রয়েছে।

বিএনপি: দলের অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজে এসব শব্দের অসংখ্য ব্যবহার লক্ষ্য করা গেছে। ২০২৪ সালের ৪ আগস্টের একটি পোস্টে লেখা ছিল, 'ইনকিলাব জিন্দাবাদ! ঢাকা আসছে জনতা, ছাড়তে হবে ক্ষমতা।' ২০২১ সালের ডিসেম্বরে পোস্ট করা হয়েছিল, 'বাংলাদেশ যাবে কোন পথে? ফয়সালা হবে রাজপথে।'

অন্যান্য দল: বামপন্থী গণসংহতি আন্দোলন ও ইসলামপন্থী জামায়াতে ইসলামীর ফেসবুক পেইজেও এসব শব্দের নিয়মিত ব্যবহার দেখা গেছে।

ইনকিলাব জিন্দাবাদ স্লোগান নিয়ে বিতর্ক

শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিএনপি নেতা ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, 'বাংলাকে যদি ধারণ করতে হয়, বাংলা ভাষাকে যদি মায়ের ভাষা বলতে হয় তাহলে ইনকিলাব জিন্দাবাদ চলবে না।' তবে ২০২৪ সালের আগস্টে বিএনপির অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজে 'ইনকিলাব জিন্দাবাদ' স্লোগান ব্যবহার করা হয়েছিল।

এই বিতর্কে স্পষ্ট যে, বাংলা ভাষায় আরবি শব্দের ব্যবহার নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও এসব শব্দের ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট গুরুত্বপূর্ণ। ভাষার বিবর্তন ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা চলমান থাকবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।