বাংলা ভাষার বিকৃতি রুখতে মুক্তবুদ্ধি ও মুক্তসংস্কৃতির চর্চা জরুরি
বাংলা ভাষার বিকৃতি রুখতে মুক্তবুদ্ধি ও সংস্কৃতি চর্চা

বাংলা ভাষার বিকৃতি: প্রকৃত সংকট ও সমাধানের পথ

চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। অনেকেই মুখের ভাষায় ‘ন্যায়বিচার’ শব্দের বদলে ‘ইনসাফ’, ‘ব্যবস্থা’র বদলে ‘বন্দোবস্ত’, ‘মীমাংসা’র বদলে ‘ফয়সালা’ ইত্যাদি ব্যবহার শুরু করেছেন। এ ধরনের প্রয়োগ ভাষার চেহারা বদলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ভাষাবিদরা। তাদের প্রশ্ন, বাংলা ভাষার নিজস্ব শব্দ থাকতে এ রকম আরোপণ বা সংযোজন কেন প্রয়োজন?

ভাষার ব্যবহার ও রাজনৈতিক পরিচয়

নতুন শব্দ ব্যবহারের প্রবণতা অনেক সময় ভাষার চেয়ে বেশি জাতিগত স্বাতন্ত্র্য বা রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রশ্ন হয়ে ওঠে। এটি ভাষিক বিকৃতি নয়, বরং একটি সামাজিক-রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। যেমন, বাংলা ভাষায় মীমাংসা, নিষ্পত্তি, ফয়সালা বা মিটমাটের অর্থ প্রায় একই। আবার ‘ন্যায়বিচার’, ‘ইনসাফ’, ‘জাস্টিস’ প্রায় সমার্থক শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ‘বন্দোবস্ত’ শব্দটিও নতুন অভিপ্রায়ে ব্যবহার শুরু হলেও এর প্রয়োগ ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের’ও আগে থেকে ছিল।

কৃত্রিম ও আরোপিত উদ্যোগ ভাষার মূল কাঠামো মেনে নেয় না, কারণ তা স্বতঃস্ফূর্ত নয় এবং ভাষা ব্যবহারকারীর বড় অংশ এর বাইরেই থেকে যায়। ভাষা শেষ পর্যন্ত ব্যবহারকারীর সম্মিলিত চর্চায় টিকে থাকে।

শিক্ষাক্ষেত্রে ভাষা-আধিপত্য ও বৈষম্য

বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশের দাবি থেকে ছাত্রদের আন্দোলন শুরু হয়। শিক্ষাক্ষেত্রে ইংরেজি মিডিয়াম, ইংরেজি ভার্সন আর মাদ্রাসাশিক্ষা সবই সাধারণ শিক্ষার সঙ্গে একীভূত করা হলে কী ঘটতে পারে? এভাবে আর্থিক বৈষম্য অথবা ভাষা-আধিপত্য কি রোধ করা সম্ভব? একটি রাষ্ট্রে বহু ভাষা বিদ্যমান থাকতে পারে, শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বহু ভাষার সুযোগ রাখাটাও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু যে শিশু প্রথম স্কুলে যায়, তার শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে মাতৃভাষা ভিন্ন অন্য ভাষা চাপিয়ে দেওয়া যায় না। এটা ভাষা-অধিকারের প্রশ্নে রীতিমতো অপরাধ।

তবে বহুমুখী ও বৈচিত্র্যপূর্ণ শিক্ষাকাঠামো রাষ্ট্রব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ায়। শিক্ষার্থীর জন্য বিকল্প মাধ্যম বা ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ শিক্ষাস্তরের কোন পর্বে রাখা হবে, সেটি নিয়ে চিন্তা করা যেতে পারে।

প্রমিত উচ্চারণ ও তরুণ প্রজন্ম

তরুণ প্রজন্মের প্রমিত উচ্চারণ নিয়ে হতাশা অন্তত দুই দশক আগের। একটি শিশু স্কুলে ভর্তি হওয়ার পরপরই পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে প্রমিত লিখিত ভাষায় প্রবেশ করে, অথচ তার মুখের ভাষা অপ্রমিতই রয়ে যায়। এ ব্যাপারে না আছে পাঠ্যবইয়ের ভূমিকা, না আছে শিক্ষকের প্রয়াস। পরিবার ও সমাজে তো বটেই, এমনকি আনুষ্ঠানিক-প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রেও মানুষ এখন ভাষার অপ্রমিত রূপে অবলীলায় কথা বলে যায়।

মুখের ভাষাকে যদি প্রমিত করতে হয়, তবে এর দায়িত্ব স্কুলপাঠ্য বাংলা বই এবং শ্রেণিকক্ষে বাংলা শিক্ষককেই নিতে হবে।

প্রযুক্তিনির্ভর সময় ও বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ

নতুন প্রজন্ম কাগজের পত্রিকার বদলে অনলাইনে সংবাদ পড়ে, টেলিভিশনের বদলে ডিজিটাল মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে। এতে হুমকি কোথায়? বিশ্বের বড় ভাষাগুলোও ইংরেজির প্রভাব অস্বীকার করতে পারেনি। ইংরেজিকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে লাভ নেই; প্রয়োজন বাংলাকে প্রযুক্তিসক্ষম করা। অনলাইন ও ডিজিটাল মাধ্যমে ব্যবহারযোগ্যতা বাড়াতে হবে।

মুখের ভাষাকে লেখায় ও লেখাকে কথায় রূপান্তরের প্রযুক্তি তৈরি হয়েছে বটে, কিন্তু ব্যবহার সীমিত। মানসম্মত ডিজিটাল অভিধান নেই, অনুবাদব্যবস্থা মসৃণ নয়, ভাষা সম্পাদনার কার্যকর অ্যাপসের অভাব রয়েছে। ফন্ট রূপান্তরেও জটিলতা রয়ে গেছে। প্রযুক্তিতে বাংলা অক্ষর যুক্ত হতে বিলম্ব হওয়ায় এখনো অনেকে ইংরেজি হরফে বাংলা লেখেন। পরিভাষা উন্নয়নের ঘাটতিতেও যন্ত্রের নির্দেশিকায় ইংরেজির আধিপত্য বজায় রয়েছে।

মুক্তবুদ্ধি ও মুক্তসংস্কৃতির চর্চা

ভাষার স্বার্থেই নতুন প্রজন্মকে সংস্কৃতিমনা করে তোলা এখন সময়ের দাবি। তুর্কি, হিন্দি, ইংরেজি, ফারসি, কোরিয়ানসহ নানা ভাষার নাটক ও চলচ্চিত্র বিশ্বজুড়ে দেখা হচ্ছে। শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চাই ভাষার শক্তি বাড়ায়। কাগজের বই পাঠক হারালে হতাশ হওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং পাঠযন্ত্রকে সহজলভ্য করতে হবে। প্রকাশনা সংস্থাগুলো নিজেদের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে স্বল্প মূল্যে ডিজিটাল বই সরবরাহের উদ্যোগ নিতে পারে।

মুখের ভাষার বিকৃতি বা লেখার অপপ্রয়োগ বাংলা ভাষার মূল সংকট নয়; প্রকৃত হুমকি হলো প্রযুক্তিতে এর ব্যবহারযোগ্যতা বাড়াতে ব্যর্থতা। এ কাজে দেরি হলে ভাষার পরিসর সংকুচিত হবে। প্রয়োজন দক্ষ ভাষাবিদ ও ভাষাদক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরি করা। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগগুলোকে সাহিত্য পাঠের পাশাপাশি ভাষাপ্রযুক্তি ও প্রয়োগভিত্তিক দক্ষতায় জোর দিতে হবে।

তারিক মনজুর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। মতামত লেখকের নিজস্ব।