ফেসবুক উসকানিতে সংবাদপত্র ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলা: মেটা ও কর্তৃপক্ষের নীরবতা
ফেসবুক উসকানিতে সংবাদপত্র ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলা

ফেসবুক উসকানিতে সংবাদপত্র ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলা: মেটা ও কর্তৃপক্ষের নীরবতা

২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় দুটি সংবাদপত্র প্রথম আলোদ্য ডেইলি স্টার এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানটউদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কার্যালয়ে ব্যাপক হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। দ্য ডেইলি স্টার ও ডিসমিসল্যাবের যৌথ অনুসন্ধানে প্রকাশ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে উসকানিমূলক পোস্টের মাধ্যমে এই সহিংসতা সংগঠিত হয়েছিল।

উসকানির সূচনা ও বিস্তার

১৫ ডিসেম্বর থেকে শুরু করে ফেসবুকে ‘ভারতবিরোধী চূড়ান্ত আন্দোলন’‘ভারতবিরোধী সৈনিক’ গ্রুপে সংবাদপত্র দুটির বিরুদ্ধে বিদ্বেষপূর্ণ বয়ান তৈরি হতে থাকে। পোস্টগুলোতে প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারকে ‘ভারতের দালাল’‘রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ১৮ ডিসেম্বর রাতে সরাসরি সহিংসতার আহ্বান তীব্র আকার ধারণ করে, যেখানে ‘জয় বাংলা করা’ শব্দগুচ্ছ ধ্বংসের অর্থে ব্যবহৃত হয়।

হামলার ক্রমবিকাশ

১৮ ডিসেম্বর রাত সোয়া ১১টার দিকে কারওয়ান বাজারে প্রথম আলোর কার্যালয়ে মব জড়ো হতে শুরু করে। পরবর্তী ৩০ মিনিটে তারা ভবনে হামলা চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। একই সময়ে দ্য ডেইলি স্টার ভবনেও অনুরূপ হামলা সংঘটিত হয়। ইনফ্লুয়েন্সার ইলিয়াস হোসাইনপিনাকী ভট্টাচার্যর মতো ব্যক্তিরা ফেসবুকে সরাসরি সহিংসতার নির্দেশনা দেন, যা দ্রুত ভাইরাল হয়।

  • হামলার সময় ফেসবুকে অন্তত ৯৫৮টি স্বতন্ত্র পোস্টে সহিংসতার আহ্বান জানানো হয়।
  • এই পোস্টগুলোতে ৩ লাখ ৬০ হাজারের বেশি লাইক, শেয়ার ও মন্তব্য পড়ে।
  • ১০ লাখ সদস্যের আটটি ফেসবুক গ্রুপে ৮৮টি পোস্টে সহিংসতা উসকে দেওয়া হয়।

লক্ষ্যবস্তুর পরিবর্তন

সংবাদপত্রে হামলার পর পরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় ছায়ানট ও উদীচী। ১৯ ডিসেম্বর রাত দেড়টার দিকে ছায়ানট ভবনে আগুন দেওয়া হয়, যেখানে ভবনটি গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই দিন সন্ধ্যায় উদীচীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়েও হামলা চালানো হয়। ফেসবুকে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে হুমকিমূলক পোস্ট আগে থেকেই ছড়িয়ে পড়ছিল।

মেটা ও কর্তৃপক্ষের ভূমিকা

সহিংসতার সময় ফেসবুকে উসকানিমূলক কনটেন্ট ২০ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে দৃশ্যমান ছিল, কিন্তু মেটা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাৎক্ষণিক কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। পুলিশের সাইবার ইউনিটের প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে ম্যানুয়াল পর্যবেক্ষণই প্রধান ভূমিকা পালন করে। মেটার নীতিমালা লঙ্ঘন সত্ত্বেও অনেক পোস্ট হামলার এক মাস পরও অনলাইনে উন্মুক্ত ছিল।

  1. ইলিয়াস হোসাইনের ফেসবুক পেজ হামলার ১২ ঘণ্টা পর সরানো হয়।
  2. জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক আইরিন খান সরকার ও প্ল্যাটফর্মের ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করেন।
  3. ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি মবের বাধায় ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, ফলে উদ্ধার কাজ বিলম্বিত হয়।

দীর্ঘমেয়াদী প্রচারণা

এই হামলা আকস্মিক নয়; এক বছরের বেশি সময় ধরে পিনাকী ভট্টাচার্য ও ইলিয়াস হোসাইন ফেসবুক ও ইউটিউবে সংবাদপত্র দুটির বিরুদ্ধে বয়ান তৈরি করে আসছিলেন। ২০২৪ সালের নভেম্বরে প্রতিবাদ ও ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে শরিফ ওসমান বিন হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে উসকানি তীব্রতর হয়। ভারতীয় ফ্যাক্ট-চেকিং পোর্টাল বুমলাইভ ডট ইন এই প্রচারণাকে ‘মব হামলা উসকে দেওয়ার উদ্দেশ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করে।

এই ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানির বিপদ ও কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তার গুরুতর দিকগুলো উন্মোচন করেছে, যা গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।