কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইসলামি বক্তা মিজানুর রহমান আজহারী, ডা. তাসনিম জারা ও ডা. জাহাঙ্গীর কবীরের ডিপফেক ভিডিও বানিয়ে ভুয়া বিজ্ঞাপন তৈরি করে যৌন উত্তেজক ওষুধ বিক্রির সঙ্গে জড়িত ১০ প্রতারককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
সংবাদ সম্মেলনে তথ্য
আজ শনিবার রাজধানীর মিন্টো রোডের ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ এ তথ্য জানান।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন মো. সারাফাত হোসেন (২১), সাফায়েত হোসেন শুভ (২১), তৌকি তাজওয়ার ইলহাম (১৯), তাকিবুল হাসান (২১), আবদুল্লাহ আল ফাহিম (২২), মিনহাজুর রহমান শাহেদ (১৯), শাহামান তৌফিক (২১), ইমন হোসেন বিজয় (২১), অমিদ হাসান (২১) ও মো. ইমরান (২৪)।
প্রযুক্তির অপব্যবহার
মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ বলেন, এআই ও ডিপফেক প্রযুক্তির মাধ্যমে মিজানুর রহমান আজহারীর ছবি, ভিডিও ও কণ্ঠস্বর নকল করে প্রতারকেরা বিকৃত ভিডিও তৈরি করেছে। এসব ভিডিও দেখে মনে হয়, তিনি নিজেই বক্তব্য দিচ্ছেন এবং যৌন উত্তেজক ওষুধের প্রচার চালাচ্ছেন। এই ভিডিও বিভিন্ন ওয়েবসাইটে ছড়িয়ে দিয়ে তারা দুটি ওষুধ বিক্রি করছিল।
মামলা ও অভিযান
পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মিজানুর রহমান আজহারী প্রথম এসব ভুয়া ভিডিও দেখতে পান। পরে তিনি তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে সতর্কতামূলক পোস্ট দেন। পরে এ ঘটনায় আজহারীর অফিসের এক কর্মকর্তা তাঁর পক্ষে পল্টন থানায় সাইবার নিরাপত্তা আইনে মামলা করেন।
এ ঘটনায় অভিযান চালিয়ে চট্টগ্রাম থেকে নয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে উল্লেখ করে মতিঝিল বিভাগের ডিসি বলেন, চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকার শেরশাহ কলোনির ঈদগাহ মাঠের পাশের একটি বাসা থেকে তাঁদের আটক করা হয়। সেখান থেকে ১১টি ল্যাপটপ, ১৩টি স্মার্টফোন, ৩৪টি ফিচার ফোন, দুটি পেনড্রাইভ এবং ২১টি সিম কার্ড জব্দ করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, এটি মূলত একটি কল সেন্টার ছিল, যেখান থেকে এই অবৈধ ব্যবসা ও প্রতারণার কার্যক্রম পরিচালিত হতো।
ঢাকায় আরও গ্রেপ্তার
মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ বলেন, প্রতারণার প্রচারণা চট্টগ্রাম থেকে চালানো হলেও পণ্য সরবরাহ করা হতো দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে, বিশেষ করে ঢাকার মোহাম্মদপুর থেকে। এ ঘটনায় মোহাম্মদপুর থেকে আরও একজনকে আটক করা হয়েছে, যিনি একটি গুদামের দায়িত্বে ছিলেন। প্রতারকেরা দুটি কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে 'ক্যাশ অন ডেলিভারি' পদ্ধতিতে পণ্য সরবরাহ করতেন। এসবে কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা আছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
প্রতারকদের বয়স ও ভূমিকা
গ্রেপ্তার প্রতারকদের বয়স ১৯ থেকে ২৪ বছরের মধ্যে বলে জানান ডিসি হারুন অর রশিদ। তিনি বলেন, তাঁদের মধ্যে সারাফাত হোসেন মূল সংগঠক ছিলেন। তিনি প্রযুক্তি সম্পর্কে কিছুটা জ্ঞান রাখেন এবং ওয়েব ডিজাইন করতে পারেন। ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালাতেন তিনি। আরেকজন শাফায়েত হোসেন শুভ ডিপফেক ও এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভিডিও তৈরি করতেন।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা দীর্ঘদিন মিজানুর রহমান আজহারী, ডা. তাসনিম জারা ও ডা. জাহাঙ্গীর কবিরসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ভুয়া বিজ্ঞাপন তৈরি করে যৌন উত্তেজক ওষুধ বিক্রির সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে।
ত্রি টন ট্রাকভর্তি পণ্য জব্দ
এক প্রশ্নের জবাবে পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ভুক্তভোগীর সংখ্যা নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। কারণ, গুদাম থেকে প্রায় তিন টন ট্রাকভর্তি পণ্যের সমপরিমাণ ওষুধ জব্দ করা হয়েছে। দেশে আরও একাধিক গুদাম থাকতে পারে এবং দীর্ঘদিন ধরে এই প্রতারণা চলেছে। তাই বহু মানুষ এর শিকার হয়েছে। এসব ওষুধ সেবনে কেউ শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কি না, সেটিও জানার চেষ্টা চলছে।
যেসব ফেসবুক পেজ ও ওয়েবসাইট থেকে এসব বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়েছে, সেগুলো শনাক্ত করে বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান হারুন অর রশিদ।
গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার বলেন, কেপিআই (গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা) সুরক্ষার মূল দায়িত্ব প্রটেকশন ডিভিশনের। মতিঝিল বিভাগসহ অন্যান্য ইউনিট প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের সহায়তা দিয়ে থাকে। বিভিন্ন নির্দেশনার আলোকে নিয়মিত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।



