শ্রম সংশোধন অধ্যাদেশ নিয়ে তৈরি পোশাক খাতের তীব্র প্রতিবাদ
শ্রম সংশোধন অধ্যাদেশে বেশ কয়েকটি ধারা নিয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে তৈরি পোশাক খাতের নিট ক্যাটাগরির পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিকেএমইএ। সংগঠনের অভিযোগ, অধ্যাদেশে শ্রমিকের সংজ্ঞা নিয়ে সূক্ষ্ম কারসাজি, যৌথ দরকষাকষিতে প্রতিনিধিত্ব, শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ তহবিল এবং চাকরি অবসান সংক্রান্ত ধারাগুলো শিল্পকারখানায় মালিক-শ্রমিক বিরোধ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। এতে শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে আপত্তি ও সংশোধনের আহ্বান
রোববার (৫ এপ্রিল) রাজধানীর বাংলামটরে বিকেএমইএর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। সংবাদ সম্মেলন থেকে আপত্তিকর এসব ধারা সংশোধনের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাতীয় সংসদ সদস্যদের প্রতি জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে। সংগঠনের পক্ষ থেকে ধারাগুলোর বিস্তারিত তুলে ধরেন বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। এ সময় নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান, সিনিয়র সহসভাপতি অমল পোদ্দার, মোহাম্মদ রাশেদ এবং বেশ কয়েকজন পরিচালক উপস্থিত ছিলেন।
ত্রিপক্ষীয় পরামর্শক পরিষদের সিদ্ধান্ত উপেক্ষার অভিযোগ
মোহাম্মদ হাতেম বলেন, অধ্যাদেশ জারির আগে সরকার, মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত ত্রিপক্ষীয় পরামর্শক পরিষদ (টিসিসি) বিস্তারিত আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তবে প্রকাশিত গেজেটে দেখা যায়, টিসিসির সিদ্ধান্তের বাইরে বেশ কিছু ধারা অধ্যাদেশে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তিনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তুলে বলেন, প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী বৈঠকের কার্যবিবরণী অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে শেয়ার করা হয়ে থাকে, কিন্তু অসৎ উদ্দেশ্যে সর্বশেষ বৈঠকের কার্যবিবরণী তাদেরকে দেওয়া হয়নি।
শ্রমিকের সংজ্ঞা নিয়ে বিতর্ক ও রপ্তানি ঝুঁকি
বিগত অন্তর্বর্তী সরকার গত ১৭ নভেম্বর সংশোধিত শ্রম আইন অধ্যাদেশ জারি করে, যা এখন জাতীয় সংসদে আইন আকারে পাসের অপেক্ষায় রয়েছে। অধ্যাদেশে ‘শ্রমিক’-এর সংজ্ঞায় আপত্তি তুলে ধরে বিকেএমইএ সভাপতি বলেন, অধ্যাদেশে উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত শ্রমিকের সঙ্গে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই সংজ্ঞার কারণে সর্বনিম্ন সাড়ে ১২ হাজার টাকার মজুরির শ্রমিকের পাশাপাশি ৫৪ লাখ টাকার কর্মকর্তাকেও শ্রমিক হিসেবে দেখানো হয়েছে। অধ্যাদেশ অনুযায়ী এখন এই কর্মকর্তারা সার্ভিস বেনিফিটসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দাবি করতে পারেন, অথচ তারা শ্রম আইনের ভিন্ন ধারায় করপোরেট চাকরি বিধি অনুযায়ী অনেক বেশি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে থাকেন।
তিনি সতর্ক করে বলেন, শ্রমিকের সংজ্ঞা নিয়ে সূক্ষ্ম কারসাজির কারণে বিদেশি ব্র্যান্ড ও ক্রেতারা অডিটে নানান আপত্তি দেবেন। এর ফলে রপ্তানি আদেশ না দেওয়া বা কম দেওয়া কিংবা দর কম দেওয়ার চেষ্টা করবে তারা, যা তৈরি পোশাক খাতের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করবে।
চাকরি অবসান ও যৌথ দরকষাকষি নিয়ে উদ্বেগ
চাকরির অবসান বিষয়ে অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, স্থায়ী শ্রমিকেরা ৩ বছর পর্যন্ত প্রতি বছরের জন্য ৭ দিনের মজুরি, তিন থেকে ১০ বছরের জন্য ১৫ দিনের মজুরি এবং ১০ বছরের বেশি চাকরির ক্ষেত্রে ৩০ দিনের মজুরি পাবেন। অথচ, টিসিসিতে তিন থেকে পাঁচ বছরের কম সময়ের জন্য ৭ দিনের মজুরি এবং পাঁচ থেকে ১০ বছরের কম সময়ের জন্য ১৫ দিনের মজুরির কথা বলা ছিল। বিকেএমইএ সভাপতি এই সংশোধিত সময়সীমা গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন এবং এতে মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে বিরোধ তৈরি হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
যৌথ দর কষাকষির প্রতিনিধি (সিবিএ) সংক্রান্ত ধারা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিকেএমইএ সভাপতি। অধ্যাদেশ অনুযায়ী, একটি কারখানায় একটি ট্রেড ইউনিয়নকেই দর কষাকষির প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া যাবে। অথচ, কোনো ইউনিয়নকে সিবিএ হতে হলে নির্বাচনের মাধ্যমে অন্তত ৫১ শতাংশ শ্রমিকের সমর্থনের প্রয়োজনের কথা বলা ছিল। বিকেএমইএ নির্বাহী সভাপতি এ প্রসঙ্গে বলেন, এর কারণে শ্রমিক নেতারাই শ্রমিকদের ঠকানোর সুযোগ পাবে, যা শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
হয়রানি ও অন্যান্য বিষয়ে আপত্তি
শ্রমিকদের হয়রানি প্রসঙ্গে অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, কোনো শ্রমিক যদি হয়রানির অভিযোগ করে তাহলে মালিক কর্তৃপক্ষকে প্রমাণ করতে হবে যে শ্রমিকদের হয়রানি করা হয়নি, যা বিকেএমইএর মতে রীতিমতো হাস্যকর। এ ছাড়া, শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ তহবিল, প্রসূতি কল্যাণের মতো বিভিন্ন বিষয়ে আপত্তি করেছে সংগঠন। সংগঠনের সভাপতি বলেন, এগুলো মালিক-শ্রমিক কারও জন্যই কল্যাণকর নয় এবং পাটের মতো পোশাক খাতকে বিপন্ন করতে গত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিদেশিদের পরিকল্পনায় এসব ষড়যন্ত্র করেছে বলে মন্তব্য করেন।



