ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর পুঁজিবাজারে রেকর্ড উত্থান
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর দেশের পুঁজিবাজারে যে প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে, তা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে অন্যতম বড় উত্থান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নির্বাচন-পরবর্তী প্রথম কার্যদিবসেই ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সূচকের শক্তিশালী উল্লম্ফন, লেনদেনের ব্যাপক বৃদ্ধি এবং অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারদরের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা প্রমাণ করেছে যে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কেটে গেলে পুঁজিবাজার কত দ্রুত ইতিবাচক সাড়া দিতে পারে।
সূচক ও লেনদেনে অভূতপূর্ব বৃদ্ধি
দিন শেষে ডিএসই’র প্রধান সূচক ডিএসইএক্স বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৬০০ দশমিক ৬৫ পয়েন্টে। আগের কার্যদিবসের তুলনায় সূচকটি বেড়েছে ২০০ দশমিক ৭২ পয়েন্ট, যা ৩ দশমিক ৭১ শতাংশ বৃদ্ধির সমতুল্য। দ্বিতীয় সূচক ডিএসইএস ৩০ পয়েন্টের বেশি এবং শীর্ষ ৩০ কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএস৩০ সূচক ৮৬ পয়েন্টের উত্থান দেখিয়েছে। একদিনে এমন বিস্তৃতভিত্তিক উত্থান গত কয়েক মাসে দেখা যায়নি।
লেনদেনের ক্ষেত্রেও ফিরে এসেছে প্রাণচাঞ্চল্য। দিন শেষে ডিএসইতে মোট লেনদেন দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৭৫ কোটি টাকার বেশি, যা আগের কার্যদিবসের ৭৯০ কোটি টাকার তুলনায় প্রায় ৪৮৫ কোটি টাকা বৃদ্ধি। গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বরের পর এটিই সর্বোচ্চ লেনদেন। বাজার মূলধনও একদিনে বেড়েছে প্রায় ১২ হাজার ৩০৫ কোটি টাকা, আগের কার্যদিবসে ৭ লাখ ৮ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ২১ হাজার ২৮২ কোটি টাকায়।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রত্যাশা ও বিনিয়োগকারীদের মনস্তত্ত্ব
নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর নিরঙ্কুশ বিজয় এবং দ্রুত সরকার গঠনের সম্ভাবনা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন আস্থা তৈরি করেছে। নির্বাচন-পূর্ব সময়ে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ সুদহার, তারল্য সংকট, ডলার বাজারের অস্থিরতা ও ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতার কারণে বাজারে দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা ছিল। ফলাফল ঘোষণার পর অনেক বিনিয়োগকারী নতুন করে বাজারে অবস্থান নিতে শুরু করেছেন, বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় ছিলেন, তারা এটিকে ‘এন্ট্রি পয়েন্ট’ হিসেবে দেখছেন।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণ: ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের নেতৃত্ব
দিনের লেনদেনে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিমা ও বড় মূলধনী কোম্পানির শেয়ারে সবচেয়ে বেশি ক্রেতার চাপ দেখা গেছে। ব্যাংকিং খাত কার্যত বাজারকে টেনে তুলেছে। লেনদেনের শীর্ষে ছিল সিটি ব্যাংক, এরপর ঢাকা ব্যাংক ও স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস। এছাড়া ব্র্যাক ব্যাংক, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন, রবি, সায়হাম কটন, যমুনা ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক ও ওরিয়ন ইনফিউশন উল্লেখযোগ্য লেনদেন করেছে।
মূল্যবৃদ্ধির দিক থেকে শীর্ষে ছিল ওয়ান ব্যাংক, মুন্নু ফেব্রিকস, লংকাবাংলা ফিন্যান্স, এশিয়া ইনস্যুরেন্স ও ড্যাফোডিল কম্পিউটার্স। এদের অধিকাংশের শেয়ারদর ৯ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে, যা একদিনের সর্বোচ্চ সীমা। প্রায় ৭৫টি কোম্পানির শেয়ার সার্কিট ব্রেকারে লেনদেন হয়েছে। মোট ৩৬৪টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে, বিপরীতে কমেছে মাত্র ২৬টির, ৪টির দাম অপরিবর্তিত ছিল। এমনকি জেড শ্রেণির (লভ্যাংশহীন) কোম্পানির বড় অংশের শেয়ারও বেড়েছে, যা বাজারে সামগ্রিক ইতিবাচক মনোভাবের ইঙ্গিত দেয়।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও ইতিবাচক প্রবাহ
অন্য শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই বেড়েছে প্রায় ৪৮৪ পয়েন্ট। লেনদেন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪ কোটি ৬৫ লাখ টাকায়, যা আগের দিনের তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ।
‘রিলিফ র্যালি’ কতটা স্থায়ী? সতর্কবার্তা
বাজার বিশ্লেষকদের একাংশ এই উত্থানকে ‘রিলিফ র্যালি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও নীতিগত অস্বচ্ছতার পর স্বস্তির প্রতিক্রিয়ায় বাজারে এমন উল্লম্ফন দেখা যায়। তবে তারা সতর্ক করে বলছেন, এই উত্থান টেকসই করতে হলে কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য। প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো হলো ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, তারল্য সংকট নিরসন, সুদহার নীতিতে স্থিতিশীলতা, ডলারবাজারে ভারসাম্য, করপোরেট গভর্ন্যান্স জোরদার, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও মানসম্মত আইপিও বাজারে আনা।
ডিএসই সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারের এই ইতিবাচক গতি ধরে রাখতে হলে সরকারকে দ্রুত দৃশ্যমান সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে, বিশেষ করে ব্যাংক লুটপাট বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। ডিএসই পরিচালক মো. শাকিল রিজভী বলেন, ‘‘নির্বাচন ঘিরে বড় ধরনের সহিংসতা না হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরেছে। এই ইতিবাচক ধারা ধরে রাখতে ভালো কোম্পানির আইপিও আনা ও বাজারে সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি।’’
সামষ্টিক অর্থনীতির প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা
পুঁজিবাজার কেবল রাজনৈতিক বার্তায় চলে না, এটি সামষ্টিক অর্থনীতির প্রতিফলনও। বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চাপ, আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ স্থবিরতার মতো চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যদি নতুন সরকার দ্রুত বিনিয়োগবান্ধব বাজেট, শিল্পোৎপাদন সম্প্রসারণ এবং রফতানি প্রবৃদ্ধির নীতি ঘোষণা করে, তবে পুঁজিবাজারে আস্থার ভিত্তি আরও শক্ত হবে।
নির্বাচন-পরবর্তী প্রথম কার্যদিবসেই পুঁজিবাজারে যে শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক বার্তা বহন করে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কাটলে বিনিয়োগকারীরা যে দ্রুত সক্রিয় হন, এদিনের লেনদেন তা প্রমাণ করেছে। তবে সাময়িক উচ্ছ্বাসকে টেকসই প্রবৃদ্ধিতে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন ধারাবাহিক নীতি, সুশাসন এবং অর্থনৈতিক সংস্কার। এখন নজর থাকবে নতুন সরকার কত দ্রুত প্রতিশ্রুত সংস্কার বাস্তবায়ন করে এবং পুঁজিবাজারকে অর্থনীতির মূলধারায় কতটা কার্যকরভাবে যুক্ত করতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, বিনিয়োগকারীরা প্রস্তুত, প্রশ্ন হলো নীতিনির্ধারকরা কি সেই প্রত্যাশার সমান গতিতে এগোতে পারবেন?
