প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, বর্তমান সরকার জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে একটি সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা বলয় নিশ্চিত করার পথে হাঁটছে। তিনি বলেন, সরকার মনে করে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি।
আজ রোববার রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এ কথা বলেন। সুশাসন, নাগরিক অংশগ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে 'নাগরিকতা থিমেটিক কোলাবোরেশন অ্যান্ড নেটওয়ার্কিং ইভেন্ট' শীর্ষক এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে নাগরিকতা: সিভিক এনগেজমেন্ট ফান্ড (সিইএফ)। দিনব্যাপী এই আয়োজনে সরকারের প্রতিনিধি, উন্নয়ন সহযোগী, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যম প্রতিনিধি এবং নাগরিকতা কর্মসূচির অংশীদার সংস্থাগুলো অংশ নেয়।
সামাজিক সুরক্ষা বলয়ে ফ্যামিলি কার্ড
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, সামাজিক সুরক্ষা বলয়ের আওতায় ইতিমধ্যে 'ফ্যামিলি কার্ড' বিতরণ করা হয়েছে। এই উদ্যোগ দেশের নারীদের জন্য বিশেষভাবে সহায়ক হবে। তিনি বলেন, 'নারীর পরিবার ও সন্তানদের লালন-পালনের ক্ষেত্রে যে সহায়তা দরকার, সেটা নিশ্চিতে আমরা এই ফ্যামিলি কার্ড শুরু করেছি।'
বিএনপি সরকারের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, প্রথম বিষয় ছিল রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কার। এ ছাড়া আগামী বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা এবং দেশে দীর্ঘদিন ধরে চলা বিভিন্ন অঞ্চলগত বৈষম্য দূর করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়টিও রয়েছে।
বৈষম্যবিরোধী আইন ও মানবাধিকার
আয়োজনের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল 'বৈষম্যবিরোধী আইন, মানবাধিকারকর্মী সুরক্ষা আইন, জেন্ডার সমতা ও যুবসমাজের সম্পৃক্ততা'। প্যানেল আলোচনা ও থিমভিত্তিক ব্রেকআউট সেশনের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা এসব বিষয়ে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ, নীতিগত ও মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা এবং ভবিষ্যৎ যৌথ উদ্যোগের সুযোগ নিয়ে আলোচনা করেন।
সকালে সূচনা বক্তব্যে দেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের হেড অব কো–অপারেশন মিখাল ক্রেজা। তিনি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থাকে একটি বিশেষ রূপান্তরকাল হিসেবে অভিহিত করেন। ক্রেজা বলেন, বাংলাদেশ এমন একটি রূপান্তরকালীন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে সরকারের জবাবদিহি ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যকারিতার ওপর নতুন করে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে নাগরিকদের কণ্ঠস্বর ও স্থানীয় জ্ঞানকে জাতীয় উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা অপরিহার্য বলে তিনি মনে করেন।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম দেশের বর্তমান অবস্থাকে একটি বিশেষ সন্ধিক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, 'আমরা জানি যে আমরা এখন একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময় পার করছি বাংলাদেশে। এই রূপান্তরের সময়ে নাগরিক সমাজের সঠিক ভূমিকা নির্ধারণ করা গুরুত্বপূর্ণ।' অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া অংশীজনেরা যাতে নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও মতামত জানান, সেই আহ্বান জানান শাহীন আনাম।
উদ্বোধনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক বিশেষ সহকারী সাইমুম পারভেজ বাংলাদেশের নাগরিক সমাজকে ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী হিসেবে অভিহিত করেন। তবে আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি বলেন, 'গত এক দশকে আমরা দেখেছি যে সিভিল সোসাইটির (নাগরিক সমাজের) কাজের পরিধি অনেকটা সংকুচিত হয়ে এসেছে।' এর পেছনে আইনি বাধা এবং রাজনৈতিক চাপকে দায়ী করেন সরকারের এই প্রতিনিধি।
প্যানেল আলোচনা ও ব্রেকআউট সেশন
দুপুরে মূল থিমগুলোতে সহযোগিতা ও যৌথ অগ্রাধিকারবিষয়ক একটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা সঞ্চালনা করেন মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভের (এমআরডিআই) নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান। এতে অংশ নিয়ে সংশ্লিষ্ট চারটি থিমে সহযোগিতার ক্ষেত্র, নীতিগত সংলাপ, জনসম্পৃক্ততা এবং সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে মতামত দেন নাগরিক সমাজ, উন্নয়ন সহযোগী ও সরকারি প্রতিনিধিরা।
প্যানেল আলোচনায় বক্তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নাগরিক অধিকার ও নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
প্যানেল আলোচনার পর চারটি 'থিমেটিক ব্রেকআউট সেশন' অনুষ্ঠিত হয়। নাগরিক কর্মসূচির অংশীদার সংস্থাগুলোর সহায়তায় আয়োজিত এসব সেশনে বৈষম্যবিরোধী আইন, মানবাধিকারকর্মী সুরক্ষা আইন, যুব সম্পৃক্ততা এবং জেন্ডার সমতা বিষয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা, কাজের অগ্রাধিকার, সমন্বয়ের ঘাটতি ও ভবিষ্যৎ যৌথ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে অংশগ্রহণমূলক আলোচনা হয়।
পরে সেশনগুলোর মূল আলোচ্য বিষয় ও সুপারিশ তুলে ধরেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের ইয়ুথ অ্যান্ড সোশ্যাল কোহেশন লিড ওয়াসিউর রহমান তন্ময়। তিনি জানান, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী কোন কোন জায়গায় বৈষম্যের শিকার হয়, বৈষম্য নিরসনে বিভিন্ন অংশীজনের অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ, দায়িত্বশীল জনযোগাযোগ তৈরি, নাগরিক সমাজের পারস্পরিক সমন্বয় এবং নীতিগত প্রক্রিয়ায় ধারাবাহিক সম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
ব্রেকআউট সেশন সম্পর্কে কথা বলেন বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালক সারা হোসেন। তিনি বৈষম্য নিরসন ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকারি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ওপর জোর দেন। দুই বছর ধরে মানবাধিকার কমিশন ও তথ্য কমিশনের নিষ্ক্রিয়তায় উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি এগুলো দ্রুত সচল করার দাবি জানান। তাঁর মতে, আইনি জটিলতা কাটিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করা এখন সময়ের দাবি।
নতুন বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণে একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনের আহ্বান জানান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, বিগত ১৫ বছরের সুশাসনের অভাব কাটিয়ে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে, যেখানে প্রত্যেক নাগরিক তাঁর প্রাপ্য অধিকার ফিরে পাবেন।
বিকেলে সমাপনী অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বাংলাদেশে সুইজারল্যান্ড দূতাবাসের ডেপুটি হেড অব কো-অপারেশন কোরিন থেভেজ। তিনি সরকার, নাগরিক সমাজ, উন্নয়ন সহযোগী এবং অংশগ্রহণকারী সংস্থাগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ ও অবদানের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।



