মায়াস্থেনিয়া গ্রাভিস জয় করে মা হলেন তানিয়া
মায়াস্থেনিয়া গ্রাভিস জয় করে মা হলেন তানিয়া

নবজাতকের প্রতীকী ছবি। বিরল ও জটিল স্নায়বিক রোগ 'মায়াস্থেনিয়া গ্রাভিস'-এ আক্রান্ত হন তানিয়া খাতুন। ধরা পড়ার পর ২১ দিন আইসিইউসহ প্রায় আড়াই মাস হাসপাতালে কাটিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন তিনি। তখন চিকিৎসকেরা কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন— মা হওয়া হবে তাঁর জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু শঙ্কা কাটিয়ে তিন বছরের মাথায় তানিয়া এখন ফুটফুটে কন্যাসন্তানের মা। আজ রোববার (৩ মে) রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর এই সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়। বর্তমানে মা ও শিশু উভয়ই সুস্থ আছেন। যদিও বাড়তি সতর্কতার জন্য মাকে আইসিইউ এবং শিশুকে বিশেষ সেবা ইউনিটে (স্ক্যানু) রাখা হয়েছে। জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে আইসিইউ থেকে ফিরে মা হওয়ার এমন ঘটনা রাজশাহীতে বিরল বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।

পরিবারের পটভূমি

তানিয়া (২৫) রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বিড়ালদহ পলাশবাড়ী গ্রামের কৃষক জেবর আলীর স্ত্রী। এই দম্পতির আট বছর বয়সী আরেকটি মেয়ে রয়েছে।

রোগ সম্পর্কে

'মায়াস্থেনিয়া গ্রাভিস' হলো শরীরের একটি বিরল ও দীর্ঘমেয়াদি অটোইমিউন স্নায়বিক রোগ। সহজ কথায়, শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা (ইমিউন সিস্টেম) যখন ভুলবশত স্নায়ু ও পেশির সংযোগস্থলে আক্রমণ করে, তখন এই রোগ হয়। এর ফলে মস্তিষ্ক থেকে আসা সংকেত পেশি পর্যন্ত পৌঁছাতে বাধা পায় এবং পেশিগুলো চরম দুর্বল হয়ে পড়ে। রোগটি পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য নয়, তবে এটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

চিকিৎসার ইতিহাস

২০২৩ সালের শুরুতে হঠাৎ চোখের পাতা পড়ে যাওয়া এবং তীব্র শ্বাসকষ্ট নিয়ে রামেক হাসপাতালে ভর্তি হন তানিয়া। হাসপাতালের আইসিইউ ইনচার্জ আবু হেনা মোস্তফা কামাল জানান, পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ধরা পড়ে তিনি 'মায়াস্থেনিয়া গ্রাভিস' নামক অটোইমিউন রোগে আক্রান্ত। তখন তাঁকে ২১ দিন লাইফ সাপোর্টসহ প্রায় আড়াই মাস হাসপাতালে থাকতে হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আবু হেনা মোস্তফা কামাল জানান, ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসের ২৫ তারিখ লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। প্রয়োজন ছিল ইম্যুনোগ্লোবিউলিন। দাম ১২ থেকে ১৪ লাখ টাকা। কৃষক স্বামীর পক্ষে ১২-১৪ লাখ টাকার দেওয়া সম্ভব হয়নি। তখন নিউরোমেডিসিনের অধ্যাপক কফিলউদ্দিন ও মেডিসিনের অধ্যাপক আজিজুল হক আজাদের সঙ্গে পরামর্শ করে রোগীর স্বজনদের রাজি করানো হয় যে রোগীর শরীরের ভেতরে যে রক্তরস থাকে বের করে নতুন করে দিতে হবে। তাঁরা রাজি হন। তারপর তাঁর শরীরের দূষিত রক্তরস পাঁচবার বের করে নতুন করে দেওয়া হয়। ১০ দিন পর লাইফ সাপোর্ট খোলা হয়, এর মধ্যে জীবাণু সংক্রমণও হয়, তারপর সুস্থ হলে ২১ দিন পর আইসিইউ থেকে নিউরো ওয়ার্ডে স্থানান্তর হয়। তখন রাজশাহীতে এ ধরনের চিকিৎসা প্রথম দেওয়া হয়েছিল। ২০২৩ সালে মার্চ মাসে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিয়ে এবং ভবিষ্যতে সন্তান না নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে পাঠানো হয়।

অন্তঃসত্ত্বা হওয়া ও সিদ্ধান্ত

আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে স্বামীসহ সেই নারী আইসিইউতে দেখা করতে আসেন। ওই দম্পতি তখন জানান, গাইনি, নিউরোমেডিসিনের চিকিৎসক সবাই তাঁদের বকা দিয়েছেন, কারণ নিষেধ সত্ত্বেও ওই নারী ভুলবশত অন্তঃসত্ত্বা হয়েছেন। অনেকে পরামর্শ দিয়েছেন গর্ভপাত করাতে। কিন্তু তাঁদের পরামর্শ তাঁরা মেনে নিতে পারেননি। তিনিও প্রথমে একটু বকা দেন, পরে তাঁদের ইচ্ছাশক্তিকে সমর্থন করলেন। তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী প্রতি মাসে হাসপাতালের গাইনি ও নিউরোলজি বিভাগে চেক আপ করে আইসিইউতে দেখা করে যেতেন তাঁরা।

সফল প্রসব

হাসপাতালের গাইনি বিভাগের অধ্যাপক রোকেয়া খাতুনের নেতৃত্বে রোববার সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ওই নারী সন্তান প্রসব করেছেন উল্লেখ করে আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, 'আমার ৩১ বছরের চিকিৎসকজীবনে বিচিত্র ধরনের রোগীর জীবন–মরণের সঙ্গে থাকার সৌভাগ্য হয়েছে। লাইফ সাপোর্টে থাকা রোগীর অনেক চিকিৎসা করা হয়, কিন্তু সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে বাচ্চা হওয়ার বিষয়টি এর আগে হয়েছে কি না, আমার জানা নেই।' এটি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনি, অ্যানেসথেসিয়া, মেডিসিন, নিউরোলজি ও আইসিইউর সবার দলগত সফলতা বলে মন্তব্য করেন তিনি।